ছবি: সংগৃহীত
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তিকে মূলধারায় আসতে দেওয়া হয়নি বলে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দাবি করেছেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি বলেন, ‘সমাজে একটি শক্তি সব সময় নারীর সমান অধিকার ও ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সেই শক্তির একটি অংশ রাজনীতিতেও সক্রিয় থাকতে পারে। তবে আমাদের কাজ ছিল যাতে তারা মূলধারায় আসতে না পারে এবং আমরা সেই কাজটা করতে পেরেছি।’
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ান-এর বিশেষ আয়োজন ‘মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নয়নাদিত্যর সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশজুড়ে নানা ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। সে সময় মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর নির্যাতন এবং নারীদের নিয়ে কটূক্তির মতো ঘটনাও সামনে আসে। ৫ই আগস্টের পর পরিস্থিতি আমাদের জন্য খুবই চাপের ছিল। একদিকে ছিল বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে আমাদের নিজেদের মূল্যবোধ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছে।’
নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি জানান, তার দীর্ঘ কর্মজীবনে এতটা নারীবিদ্বেষী ভাষা আগে শোনেননি। সামাজিক মাধ্যমেও শুধু নারী হওয়ার কারণে তাকে নানা আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নারীবাদের কোনো বিরোধ নেই, বরং নারীর অধিকার রক্ষায় সরকার দুটি নতুন আইন করেছে। একটি পারিবারিক ক্ষেত্রে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং অন্যটি কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা প্রতিরোধে।’
জেল থেকে উগ্রবাদীদের মুক্তি পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আইনি জটিলতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে অনেককে আটকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে’ বলে জানান তিনি।
তার মতে, উগ্রবাদী শক্তি সমাজে আগে থেকেই ছিল এবং বিভিন্ন সময় সুযোগ পেলেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তারা কোনো নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারেনি।
যারা নারীর অধিকার ও সমান অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাদের রাজনৈতিক শক্তি যেন মূলধারায় প্রভাব বিস্তার করতে না পারে—এটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল, বলেন রিজওয়ানা হাসান।
তবে নারীর প্রতি উগ্রবাদ বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে জানিয়ে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এখন বলছেন, তার এই বক্তব্যের সঙ্গে নির্বাচনের প্রসঙ্গ যুক্ত করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে আলাপে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে নির্বাচন ও বিরোধী দলকে জড়িয়ে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তা ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ও ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’। বৃহস্পতিবার (৫ই মার্চ) সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গণমাধ্যমে এসব কথা বলেন।
সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা হচ্ছিল। এর মধ্যে নারীর প্রতি উগ্রবাদ ও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার প্রসঙ্গও আসে। উপস্থাপকের প্রশ্ন ছিল—মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর নির্যাতন এবং নারীদের নিয়ে কটূক্তির বিষয়গুলো তিনি কীভাবে দেখেছেন? এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে অনেকেই উগ্রপন্থীদের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন—এ কথাও প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন , ‘যারা কটূক্তি করেছে তাদের বিষয়ে নারী সমাজ যেমন প্রতিবাদ করেছে, লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছে, সরকারও কথা বলেছে। ফলে তারা ক্ষমা চেয়েছে। সেই সব কটূক্তি করা উগ্রবাদী শক্তি যেন মেইন স্ট্রিম (মূলধারা) না হয় সেটার বিষয়ে আমাদের (নারী সমাজকে) কাজ করতে হবে। আমি বলেছি নারী সমাজ (সরকার নয়) সেসব কটূক্তি করা শক্তিকে মেইন স্ট্রিম হতে দেয়নি।’
বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আলাপের একপর্যায়ে উপস্থাপক নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুললে তখন তিনি বলেন, বিরোধী দলের যেসব উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেসব বিষয়ে তারা কাজ করবেন। এরপর তিনি আবার মূল প্রশ্নে ফিরে গিয়ে উগ্রবাদ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন।
তার দাবি, পুরো আলোচনায় তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করেননি, কারণ সেটি প্রশ্নের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ছিল না। বিরোধী দল অবশ্যই মূলধারার অংশ—এ কথা উল্লেখ করে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমি কোনো দলকে মেইন স্ট্রিম হতে দিইনি বলে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেটা কেবলই অপব্যাখ্যা, অবান্তর এবং বিভ্রান্তিকর। আমার বক্তব্য ছিল উগ্রবাদী শক্তি বিষয়ে, কোনো দলের বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য ছিল না।’
এদিকে বৃহস্পতিবার সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ তোলেন জামায়াতে ইসলামী। দলটি এই দুই সাবেক উপদেষ্টাকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের বিচার দাবি করেছে। এ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
খবরটি শেয়ার করুন