ছবি: সংগৃহীত
প্রেস ইন্সটিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক হওয়ার পর ফারুক ওয়াসিফ ২০২৪ সালের ১লা নভেম্বর বগুড়ায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, নিজে দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
অন্যদের বরাবরই এমন পরামর্শ দিলেও সাংবাদিক ও কলামিস্ট ফারুক ওয়াসিফ নিজেই এবার ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। আজ বৃহস্পতিবার (৫ই মার্চ) দৈনিক কালের কণ্ঠের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত দীর্ঘ অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনে তার দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইট থেকে ফারুক ওয়াসিফকে নিয়ে লেখা লিংকের প্রতিবেদন ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনের মধ্যে নানানুুখী আলোচনা চলছে। সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকেও তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক পোস্টে নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ।
এতে তিনি দাবি করেন, 'ফারুক ওয়াসিফের অন্য দোষ থাকতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বচ্ছতাকে কালিমালিপ্ত করা সহজ হবে না। এ ব্যাপারে আমি সজ্ঞানে কোনো অন্যায়-অনিয়ম যে করিনি, তা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলে রাখলাম। এসব বিষয়ে আমরা প্রেস কাউন্সিলের দ্বারস্থ হবো।'
ফারুক ওয়াসিফের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি কর্তৃপক্ষের ভেরিফায়েড করা নয়। তবে সুখবর ডটকম নিশ্চিত হয়েছে, অ্যাকাউন্টটি তিনিই পরিচালনা করেন। সুখবর ডটকমের পাঠকদের জন্য তার পোস্টটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো-
"কালের কণ্ঠ পত্রিকায় পিআইবি ও আমাকে জড়িয়ে যে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, তার ভিত্তি হলো একগাদা ত্রুটিপূর্ণ কাগজ, যার কোনো ভিত্তি নাই। যেসব অনুষ্ঠানের নামে সাংবাদিকদের সই-সাক্ষর জাল করে এসব কাগজ তৈরি করা হয়েছে, সেসব অনুষ্ঠানও পিআইবিতে আমার কর্মকালে হয়নি। বরং মহাপরিচালক হিসেবে এসব অসাধু চর্চা নজরে আসামাত্রই এগুললো বাতিলের নির্দেশ দেই। সুতরাং যে অনুষ্ঠান হয়নি, যে ব্যয় হয়নি, যে টাকা অনুষ্ঠানখাতে খরচই হয়নি, সেটা একটা ইনভ্যালিড ও অস্তিত্বহীন ব্যাপার।
আলোচিত যে ২৪ লক্ষ টাকার কথা বলা হচ্ছে, তা খরচ হয়েছে বটে, তবে অনুষ্ঠান খাতে নয়। ভুয়া বিল-ভাউচার করবারও কোনো ঘটনা নাই। এই অর্থ ৪ কিস্তিতে পরিশোধিত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র ‘শ্রাবণ বিদ্রোহ’ তৈরির কাজে। চলচ্চিত্রটি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যাট-ট্যাক্সসহ পিআইবি মারফত মোট ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা প্রাপ্ত হন (যার প্রমাণপত্র সংরক্ষিত রয়েছে)।
গত বছরের ১৮-১৯শপ ফেব্রুয়ারিতে পিআইবিতে অন্তর্বতী সরকারের ঘোষিত তারুণ্যের উৎসবের অংশ হিসেবে এই চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হয়। এটা এখনো জুলাই গণবিদ্রোহের ওপর নির্মিত সবচেয়ে কম খরচে তৈরি সবচেয়ে অথেন্টিক তথ্যচিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হয়।
তারুণ্যের উৎসব ২০২৫-এর অংশ হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় দুদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানমালা আয়োজনের ভেন্যু হিসেবে পিআইবিকে নির্বাচন করে। তবে ১৮-১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এর এই উৎসবের খরচ পিআইবি থেকে দেওয়া হয়নি। এটা সম্মিলিতভাবে সকল দপ্তর-সংস্থার চাঁদার ভিত্তিতে নির্বাহ করা হয়। সুতরাং এই অনুষ্ঠানমালা দেখিয়ে পিআইবি’র নামে বিল-ভাউচার তৈরির কোনো সুযোগ নাই। তাছাড়া পিআইবির আয়-ব্যয় সবই ডিজিটাল নথির (ডি-নথি) মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেখানেও এরকম কিছু নাই। এই কাগজগুলো অসাধু উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।
তাহলে কী হয়েছিল?
‘শ্রাবণবিদ্রোহ’ চলচ্চিত্র তৈরি ও তারুণ্যের উৎসব ২০২৫-এ প্রথম প্রিমিয়ার হবার পর এর খরচ পরিশোধের প্রশ্ন আসে। তখন ২০২৫ সালের ৩রা জুন সুনির্দিষ্টভাবে ‘ডকুমেন্টারি/চলচ্চিত্র প্রস্তুতকরণ ও প্রদর্শনের ব্যয় নির্বাহের জন্য’ পুনঃউপযোজনের সরকারি মঞ্জুরী জ্ঞাপন করা হয় (পত্র নং: ১৫,০০,০০০০,০১৬,২০,০০৬,২১-২৩০)।
এরই আলোকে পিআইবি শ্রাবণ বিদ্রোহ নির্মাণ বাবদ ওই ২৩ লক্ষ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করে। (নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্তিস্বীকারসহ যাবতীয় নথি পিআইবিতে সংরক্ষিত রয়েছে)।
এই ঘটনাটিকেই বিকৃত করে পিআইবি-র ভেতর ও বাইরের একটি চক্র সংবাদমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করতে একগুচ্ছ নকল নথিপত্র তৈরি করে পিআইবি ও আমার এক বছরের সকল অর্জনকে ধুলিস্যাত করতে নেমেছে। এমনকি কালের কণ্ঠের ওই ভিত্তিহীন প্রতিবেদন হুবহু কপি করছে একই গ্রুপের মালিকানাধীন আরো আরো পত্রিকা। সাংবাদিকতার এথিকস বলে আমি জিজ্ঞাসা করতে পারি যে, আমি তো কালের কণ্ঠের সাথে কথা বলেছি, কিন্তু আপনারা আমার বা আমাদের বক্তব্য ছাড়া কপি-পেস্ট করলেন কোন নৈতিকতা বলে?
৪০০ সাংবাদিকের সাক্ষর জাল করার উদ্দেশ্য কী হতে পারে? পুরো সাংবাদিক সমাজকে পিআইবি ও এর বর্তমান মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে একযোগে খেপিয়ে তোলা।
যাহোক, আমরা বিষয়টি উপযুক্ত পক্ষ মারফৎ যাচাই করতে প্রস্তুত। ফারুক ওয়াসিফের অন্য দোষ থাকতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বচ্ছতাকে কালিমালিপ্ত করা সহজ হবে না। এ ব্যাপারে আমি সজ্ঞানে কোনো অন্যায়-অনিয়ম যে করিনি, তা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলে রাখলাম।
উল্লেখ্য যে, এই অর্থ পিআইবির নয়, এটা অর্থ মন্ত্রণালয় কতৃক মঞ্জুর করা তথ্য মন্ত্রণালয়ের টাকা। পিআইবি এখানে বাহকমাত্র।
সংযুক্তি: পিআইবি কর্মকর্তা সাংবাদিক গোলাম মোর্শেদের উক্তি বলেও তারা যা ছাপিয়েছে, তিনি তা বলেননি। এসব বিষয়ে আমরা প্রেস কাউন্সিলের দ্বারস্থ হবো।"
খবরটি শেয়ার করুন