বুধবার, ৪ঠা মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০শে ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে সরকার *** বিদ্রোহী কুর্দিদের অস্ত্র দিয়ে ইরানে ‘গৃহযুদ্ধের’ পরিকল্পনা ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর *** নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলেই কি সর্বোচ্চ নেতা হচ্ছেন? *** হায়েনাদের ছোবল: মেয়ে শিশুদের আহাজারি, মৃত্যু বন্ধ হবে কি? *** ইরানে হামলা বন্ধ করতে বলল চীন *** ই-হেলথ কার্ড চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার মাজারে চিফ হুইপসহ হুইপবৃন্দের শ্রদ্ধা *** অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে যা বললেন মির্জা ফখরুল *** চাঁদাবাজদের তালিকা করে শিগগিরই অভিযান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আনসারকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতির আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

হায়েনাদের ছোবল: মেয়ে শিশুদের আহাজারি, মৃত্যু বন্ধ হবে কি?

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০৬:৩৪ অপরাহ্ন, ৪ঠা মার্চ ২০২৬

#

প্রতীকী ছবি

শায়লা শবনম

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এসব ঘটনা পারিবারিক আতঙ্ক ও সামাজিক উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। গত সোমবার সীতাকুণ্ডে আট বছরের মেয়ে শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসনালী কেটে হত্যা করা হয়।

গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় এক কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।

এর আগে গত বছরের মার্চে মাগুরায় যৌন নিপীড়নের ফলে আট বছরের শিশুর মৃত্যু হয়— এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিক বা পারিবারিক ক্ষত সৃষ্টি করছে না, বরং সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে— এসবের শেষ কোথায়?

সীতাকুণ্ডে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ঘটনায় দেখা গেল, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার ছোট্ট মেয়েটি শ্বাসনালী কাটা অবস্থায়ও বাঁচার চেষ্টা করেছে। শ্বাসনালী কাটা অবস্থায়ও সে দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেছে।

শিশুটির সঙ্গে আসলে কী ঘটেছে, বাড়ি থেকে প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার দূরের দুর্গম পাহাড়ে কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল- তা বিস্ময়কর। 

এ ঘটনার ভয়াবহ দিক হলো, শিশুটি সকালে বাড়ি থেকে মাকে খেলতে যাওয়ার কথা বলে বের হয়েছিল। এরপর নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার ছোট্ট মেয়েটি শ্বাসনালী কাটা অবস্থায় শিশুটির রক্তাক্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে ঘটনাটি সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

পুলিশ জানিয়েছে, সীতাকুণ্ডে শিশুটিকে চকলেট আর বেড়ানোর কথা বলে জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিল এক প্রতিবেশী। তারা পুরো ঘটনা তদন্ত করছেন। ইতোমধ্যে ওই ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মূল অভিযুক্ত বাবু শেখকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পার্কের একটি সিসিটিভি ফুটেজে শিশুটিকে বাবু শেখের হাত ধরে হেটে যেতে দেখা গেছে। 

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবু শেখ পুলিশকে বলেছেন, জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে তিনি প্রথমে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় শিশুটি চিৎকার করে বাবাকে বলে দেওয়ার কথা জানালে বাবু শেখ তার মুখ চেপে ধরে। এরপর গলা কেটে মৃত ভেবে সেখানেই রেখে চলে আসে।

এর আগে নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় স্থানীয় অভিযুক্তরা এক কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর হত্যা করে। আর মাগুরায় আট বছরের শিশুটি বোনের শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নিপীড়নের শিকার হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের কেউ অপরিচিত নন— কেউ নিকটাত্মীয়, কেউ প্রতিবেশী।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে গত ৮ বছরে ৩ হাজার ৪৩৮টি শিশু ধর্ষণের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩৯ জনের বয়স ৬ বছরের কম এবং ৭–১২ বছর বয়সীদের মধ্যে রয়েছে ৯৩৩ জন।

এছাড়াও, ২০২৪ সালে মাত্র এক বছরে ছেলে শিশুর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬টি, তবে মামলা হয়েছে মাত্র ২৪টি। 

ইউনিসেফের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১১ জনে একজন ছেলে শিশু শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর ধর্ষণকারী তার পরিচিত কেউ—পরিজন, বন্ধু বা পরিবারের বিশ্বস্ত ব্যক্তি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আরএআইএনএন-এর অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, ১০০টি যৌন নির্যাতনের ৯৩টির অভিযুক্ত ভুক্তভোগী শিশুর পরিচিত কেউ। এর মধ্যে পরিবারের সদস্য থাকে ৩৪ শতাংশ, পরিচিত থাকে ৫৯ শতাংশ।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, নিকটাত্মীয়দের প্রতি যে আস্থা থাকে, সেটিই শিশুর জন্য ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তাদের মতে, কাকা-মামা বা পরিবারের পরিচিতদের ক্ষেত্রে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই আস্থা রাখে। শিশুদের সঙ্গে আস্থা ও পরিচিতি ব্যবহার করেই পেডোফাইলরা তাদের নিপীড়ন করে। 

অনেক অভিভাবক সন্দেহ ছাড়াই শিশুদের নিকটাত্মীয়দের কাছে পাঠান, আর শিশুকামী দুর্বৃত্তরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে থাকে। অন্যদিকে বাইরের মানুষের ক্ষেত্রে অনেক সতর্কতা থাকে, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রশ্ন তুলতে কেউ ভাবে না, তাই তারা সহজেই শিকার হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা নির্যাতনের শিকার হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যেমন- শিশুর বাহ্যিক সৌন্দর্য, দুর্বল বা বিপজ্জনক পরিবেশে থাকা, নিম্নবিত্ত পরিবারে নিরাপত্তার অভাব।

এছাড়া দারিদ্র্য ও নিরাপত্তার অভাব শিশুর শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, পারিবারিক দ্বন্দ্বও এই ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিও এই সমস্যার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছেন, দেশে প্রচুর শিশু-কামী ব্যক্তি রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা না থাকায় একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে অপরাধীরা সহজেই তাদের ইচ্ছা পূরণ করেন।

বিশ্বব্যাপী এ ধরনের ঘটনার অনেক উদাহরণ রয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে শিশুরা সাধারণত পরিবারের পরিচিতদের কাছেই নির্যাতনের শিকার হয়, আর আইনশৃঙ্খলার তৎপরতার অভাব, লঘু শাস্তি বা শাস্তি না হওয়ায় এসব ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও এই ধারা লক্ষ্য করা যায়। 

২০২৩ সালের নভেম্বর, ঢাকা মেট্রোপলিটনের শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার বিষয়ে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, শিশুদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে নির্যাতনকারী যৌনতৃপ্তি লাভ করে বা নিজেকে নিয়ে পৌরুষ মনোবৃত্তি পূরণ করে থাকে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো- আইনশৃঙ্খলা শক্তিশালী করা এবং শাস্তির উদাহরণ স্থাপন করা। একবার সরকার ও পুলিশ যথাযথ উদাহরণ স্থাপন করলে অপরাধ কমবে।

তবে আইনশৃঙ্খলা ঠিক করলেই যথেষ্ট নয়; অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের নিরাপত্তা ও যৌন শিক্ষা প্রদানও অত্যন্ত জরুরি।

শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো- আইনশৃঙ্খলার শক্তিশালী প্রয়োগ ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বাবা-মা ও অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো, শিশুদের যৌন শিক্ষা দেওয়া এবং পরিচিত-নিকটাত্মীয়ের প্রতি সতর্ক রাখা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের কী ধরনের স্পর্শ ঠিক বা ভুল তা শেখানো খুব জরুরি। পরিচিত-নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে নিরাপদ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অভিভাবকরা নিয়মিত নজরদারি করলে অনেক ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

পাঠ্যক্রমে যৌন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তা কার্যকরভাবে শিশুদের কাছে পৌঁছায় না। ফলে সচেতনতা তৈরি হয়নি এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।

দেশে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি রুখতে রাষ্ট্র, আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং পরিবারগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে।

শুধু শাস্তি নয়, সামাজিক সচেতনতা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও নজরদারির সমন্বয় ছাড়া শিশুরা নিরাপদ থাকবে না। না হলে তাদের আহাজারি সমাজে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়বে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনার ভয়াবহতা প্রতিরোধে সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করা জরুরি। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে, তাদের আহাজারি, মৃত্যু শুধু সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শায়লা শবনম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250