ছবি: সংগৃহীত
‘একের পর এক বিস্ফোরণ, ধ্বংসযজ্ঞ, এখানে যা ঘটছে তা অবিশ্বাস্য। প্রতিটি দিন যেন মনে হচ্ছে একেকটি মাস। মুহুর্মুহু হামলা করা হচ্ছে।’ ইরানের রাজধানী তেহরানের চিত্র তুলে ধরতে এসব কথা বলছিলেন সালার। খবর বিবিসির।
ইরানে হামলা শুরু হয়েছে গত শনিবার থেকে। তেহরান ছাড়াও অন্যান্য শহরেও ব্যাপক হামলা করা হচ্ছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জেরে অনেকেই এ শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির (এইচআরএনএ) তথ্যমতে, গত ছয় দিনে মার্কিন-ইসরায়েল হামলায় দেশটিতে ১১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কেবল একটি স্কুলেই বিস্ফোরণের ঘটনায় মারা গেছে ১৬০ শিক্ষার্থী। হামলার শুরুতেই নিহত হয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
অথচ পরিস্থিতি এখন এমন যে, এই নেতার মৃত্যুতে কেউ যেন নিজের স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব প্রকাশ করতে না পারে, সে জন্যও সতর্ক অবস্থানে নিরাপত্তা বাহিনী। লোকজন যেন বাইরে কোনো জমায়েত করতে না পারে, তাই তাদের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি আরও শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের জন্য।
সালার বলেন, ‘একেকটা বিমান হামলার শব্দ এত বিকট যে, তাতে পুরো বাড়ি যেন কাঁপতে থাকে। ঝনঝন করতে থাকে জানালার কাচগুলো।’
কোনো সংবাদপত্র নেই, ইন্টারনেট সংযোগ নেই। পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এখন তেহরানবাসী। এমনকি নিজ দেশের ভেতরে কী হচ্ছে, তা-ও জানেন না তারা। সবাই এক রকম গৃহবন্দী। খুব প্রয়োজন না হলে বাইরে বের হচ্ছেন না কেউই।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হয়ে গেছে আকাশচুম্বী। সামান্য রুটির জন্য বাসিন্দাদের এখন লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তাদের কেউই বুঝতে পারছেন না, এ যুদ্ধের ফায়দা আসলে কী, এ যুদ্ধ আদৌ তাদের, তাদের পরিবারের বা রাষ্ট্রের জন্য কোনো অর্থ বহন করে কি না।
সালার বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এই যুদ্ধের পর আমরা কেউ আর আগের মতো থাকব।’ গত বছর ১২ দিনের যে যুদ্ধ হয়েছিল, তার থেকে এই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ অন্য রকম, জানালেন সালারের প্রতিবেশী আরেকজন।
সালার ইতিমধ্যেই তার মা-বাবাকে তেহরানের উত্তরাঞ্চলে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যদিও তিনি জানেন না, সেখানে তারা নিরাপদে থাকবেন কি না।
হামলা পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, আশির দশকে ৮ বছর ধরে চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধকেও হার মানিয়েছে। প্রতিদিনই তেহরান ছাড়ছেন শত শত মানুষ। নেটওয়ার্ক না থাকায় প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছেন না তারা। আর কোনোদিন প্রিয় মুখগুলো দেখতে পারবেন কি না, জানেন না কেউ।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এতটাই কঠোর যে, সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াও তারা সংগ্রহ করতে পারেননি। কেউ কেউ তার মৃত্যু উদ্যাপন করতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। আবার অনেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে যে শোক প্রকাশের আয়োজন করেছিলেন, তাতে অংশ নিয়েছেন।
বিবিসির সঙ্গে কথা হয় কাভেহ নামের এক তরুণের সঙ্গে। তিনি বললেন, তিনি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি খবরটি। কাভেহ এখন মনে করেন, এই যুদ্ধ সহজে শেষ হওয়ার নয়। চারদিকে কেবল অন্ধকার। তাই স্রষ্টার কাছে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তাদের।
আরেক তরুণ বলেন, ‘রাস্তার মোড়ে মোড়ে এখন চেকপোস্ট। নিরাপত্তারক্ষীরা নিজেদের ছায়াকেও যেন ভয় পাচ্ছেন, বিশ্বাস করতে পারছেন না। আর আমরা অপেক্ষা করছি সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন আমরা সবাই আনন্দে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসব বিজয় উদ্যাপন করতে।’
খবরটি শেয়ার করুন