লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্থল ও বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। হামলায় ধসে যাওয়া একটি ভবনে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজতে দেখা যায় অনেককে। গতকাল বৃহস্পতিবার লেবাননের বৈরুতে। ছবি: এএফপি
ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়েছে। যুদ্ধের ষষ্ঠ দিন গতকাল বৃহস্পতিবারও (৫ই মার্চ) ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে।
সে অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানও। এদিকে এই যুদ্ধ নিয়ে কোনো কোনো মহল নিন্দা জানালেও এখন পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা বা দুই পক্ষকে আলোচনায় বসানোর কোনো তৎপরতা নেই। খবর সিএনএনের।
বিবিসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে গতকাল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা পর্যন্ত ইরানে কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের হামলায় মোট ২৬ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের হামলায় ইসরায়েলে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া লেবাননে গত সোমবার থেকে ইসরায়েলি হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা কমপক্ষে ১০২।
গতকাল তেহরানে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ১১টি হাসপাতাল, সাতটি জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র, নয়টি অ্যাম্বুলেন্স এবং চারটি অন্যান্য চিকিৎসা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির দাবি, শনিবার থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩২টি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে অন্তত ৬৩৬টি স্থানে আঘাত হানা হয়েছে, যার মধ্যে ১০৫টি বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে। আল জাজিরা জানায়, গতকাল ইরানের দুটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। তবে সেখানে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা (মোবাইল মিসাইল লঞ্চার) ধ্বংস অব্যাহত রয়েছে। আবার ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, ইরানের কোম শহরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থায় হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া, ইসফাহান শহরের একটি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরানের জ্বালানিমন্ত্রী আব্বাস আলিবাদি বলেছেন, যৌথ হামলায় দেশব্যাপী বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে লেবাননে হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, চলমান অভিযানের কারণে ইতিমধ্যে ৩ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
টানা কয়েক দিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় হামলা চালাচ্ছে ইরান। গতকাল কুয়েতে মার্কিন বাহিনীর ওপর আবারও হামলা চালিয়েছে তারা। এ ছাড়া ইরানের সীমান্তবর্তী ইরানের কুর্দিস্তানে গত বুধবার রাত থেকে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইরান।
ইরাকের খোর আল-জুবাইর বন্দরে তেল ট্যাংকারে হামলা হয়েছে গতকাল। হামলা হয়েছে বাহরাইনে। এএফপি জানিয়েছে, রাজধানী মানামায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
গতকাল ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত এসব মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলায় সেগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল তারা উপসাগরে একটি মার্কিন তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধের শুরু থেকে নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়ে আসছে বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘ। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এই হামলা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ভয়ংকর হুমকির। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই হামলা বন্ধ করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে এই যুদ্ধ থামাতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেন, ‘জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব...তারা যদি চায় তাহলে সত্যিকার অর্থেই পদক্ষেপ নিতে পারে। কারণ তাদের কোনো উদ্যোগ নিতে বাধা নেই।’
ইরানের এই আহ্বানের ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত জাতিসংঘ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর পর কার্যত নীরব থাকলেও পরে হামলার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা জানিয়েছে ইরানের অন্যতম মিত্র চীন। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সা’রকে টেলিফোন করে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।
তিনি বলেছেন, মধ্যস্থতার জন্য চীন মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ দূত পাঠাবে। সৌদি আরব ও আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক ফোনালাপের পর চীনা মন্ত্রী বুধবার এ কথা জানান।
হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইরানের আরেক কৌশলগত মিত্র রাশিয়া। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘মানবিক নৈতিকতার সব নিয়মকানুনের নিষ্ঠুর লঙ্ঘন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে এর থেকে বেশি কোনো পদক্ষেপ এখনো নিতে দেখা যায়নি। গতকাল রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিন বলেছে, ইরান রাশিয়ার কাছে কোনো অস্ত্র সরবরাহ বা সহায়তার অনুরোধ করেনি।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীন ও রাশিয়া এই ইস্যুতে যেভাবে কথা বলেছে, তাতে শুধু এটাই বোঝা যায় যে তারা ইরানের মিত্র। কিন্তু এ দুটির মধ্যে কোনো দেশ থেকেই এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে তারা এ সংঘাতে হস্তক্ষেপ করবে এবং ইরানকে সামরিকভাবে সাহায্য করবে।
চীনের অবস্থান নিয়ে আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির পাবলিক পলিসি ও গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সহযোগী অধ্যাপক ডিলার লহ। তার মতে, চীন নিজের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুকে ঝুঁকির মুখে ফেলে কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
আর রাশিয়ার চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘ভালদাই ডিসকাশন ক্লাব’-এর সদস্য আন্দ্রেই কর্তুনভ বলেন, রাশিয়া ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামার ঝুঁকি নেবে না। কারণ মস্কো এখন ইউক্রেন সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এর আগে গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার পরও রাশিয়া কেবল নিন্দাই জানিয়েছিল, সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
এদিকে ইউরোপের দেশগুলো এই যুদ্ধ বন্ধের কথা বলছে। তবে যুদ্ধ বন্ধে কোনো উদ্যোগ এখনো তাদের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি। বরং ইরানের পরমাণু ও ব্যালিস্টিক কর্মসূচি নিয়ে কথা বলেছে।
হামলার শুরুর পর ১লা মার্চ মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানায়, তারা চায় ইরান পরমাণু কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসুক, ব্যালিস্টিক কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরুক।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে এই যুদ্ধ নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। এর ফলে কৌশলগত একটি শূন্যতাও দেখা দিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন