ছবি: সংগৃহীত
শায়লা শবনম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—উচ্চপদস্থ উপদেষ্টাদের লাল পাসপোর্ট (ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট) ত্যাগ করে সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট গ্রহণ। বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থানের কৌশল হিসেবে দেখছেন। নির্বাচন-পরবর্তী আইনি জটিলতা বা বিদেশ ভ্রমণের সরকারি বাধ্যবাধকতা এড়াতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্প্রতি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে অন্তত পাঁচজন উপদেষ্টা এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম লাল পাসপোর্ট ছেড়ে সবুজ পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া আরও তিনজন উপদেষ্টা পাইপলাইনে রয়েছেন। এই পদক্ষেপ প্রশাসনিক প্রটোকল ও নৈতিকতার পরিপন্থি বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছেড়ে সাধারণ পাসপোর্ট নেওয়া নজিরবিহীন। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মন্তব্য করেছেন, “লাল পাসপোর্ট সমর্পণ রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ। এটি নিয়ম অনুযায়ী হওয়া উচিত। আইন বা প্রটোকল উপেক্ষা করে কেউ কাজ করলে জনগণ বিক্ষুব্ধ হবে।”
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, “উচ্চপদস্থরা লাল পাসপোর্ট ছেড়ে সবুজ পাসপোর্ট নেওয়ায় জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে তারা সম্ভবত বড় ধরনের কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন মন্তব্য করেছেন, “রাষ্ট্রসেবার মহান দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিজের স্বার্থে নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করছেন। এটি জনগণের ওপর সরকারের আস্থা হ্রাস এবং প্রশাসনিক নীতিমালার চরম লঙ্ঘন।”
সবুজ পাসপোর্ট নেওয়া উপদেষ্টাদের তালিকায় রয়েছেন-
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া – স্থানীয় সরকার ও যুব ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা
অধ্যাপক ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার – প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা
আদিলুর রহমান খান – মানবাধিকার কর্মী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা
খোদা বকশ চৌধুরী – স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা
আলী ইমাম মজুমদার – খাদ্য ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা
এই তালিকার বাইরে অন্য কাউকে সবুজ পাসপোর্ট দেওয়া হয়নি। তবে আরও তিনজন বর্তমানে পাইপলাইনে রয়েছেন।
কূটনৈতিক পাসপোর্টে বিদেশ ভ্রমণ করতে সরকারি আদেশ প্রয়োজন, যেখানে সবুজ পাসপোর্টে তা বাধ্যতামূলক নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় লাল পাসপোর্ট ছেড়ে সবুজ পাসপোর্ট নেওয়া নির্দেশ করে যে তারা ভবিষ্যতের আইনি বা রাজনৈতিক দায় এড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এটি প্রশাসনিক নীতির পরিপন্থী এবং অপেশাদারিত্বের চরম উদাহরণ।
ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান মন্তব্য করেন, “উচ্চপদস্থদের এমন আচরণ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ওপর সরাসরি আঘাত এবং প্রটোকলের লঙ্ঘন। এটি প্রমাণ করে যে তারা ন্যূনতম নৈতিক দায়বদ্ধতা রাখে না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ম এড়িয়ে নিরাপদ প্রস্থান খুঁজছে।”
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, “রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের ওপর নির্ভর করাটাই ছিল বড় ভুল। অনেক উপদেষ্টা তলে তলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আঁতাত করছেন। গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।”
কর্নেল কাজী শরীফ উদ্দিন মন্তব্য করেছেন- “উচ্চপদস্থরা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে নিজের প্রাণ বাঁচানোর পথ তৈরি করছেন। এটি নৈতিক ও প্রশাসনিক অপরাধের দৃষ্টান্ত।”
ভূমি ও খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানান, “উচ্চপদে দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমার সাধারণ পাসপোর্ট ছিল। সুবিধা বজায় রাখতে পুনরায় আবেদন করেছি। দেশ ছেড়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। এটি আমার নাগরিক অধিকার।”
উচ্চপদস্থদের লাল পাসপোর্ট ছেড়ে সবুজ পাসপোর্ট গ্রহণ একটি প্রশাসনিক ও নৈতিক সংকটের প্রতিফলন। এটি নির্দেশ করে যে তারা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইনি বা রাজনৈতিক দায় এড়াতে নিজেদের নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করতে আগেভাগে পদক্ষেপ নিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোয় প্রশ্ন তুলে এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রতি অবহেলার ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, উপদেষ্টাদের এই আচরণ সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার জন্য মারাত্মক সংকেত। নির্বাচন এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় এই ধরনের ঘটনা প্রশাসনিক দায়িত্ব, নৈতিকতা ও রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের জন্য চরম প্রশ্ন তোলে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন