বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এবং প্রয়াত কবি সৈয়দ শামসুল হকের অনুমোদন নেওয়া বা নিবন্ধন (লাইসেন্স) পাওয়া বেসরকারি দু'টি টিভি চ্যানেল কখন সম্প্রচারে আসবে, বা আদৌ সম্প্রচারে আসবে কী না, এমন প্রশ্ন উঠেছে। সরকার থেকে টিভি চ্যানেলের অনুমোদন পাওয়ার পর নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত যে সময়ের মধ্যে পরীক্ষামূলক ও পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচার শুরু করার বাধ্যবাধকতা আছে, সেই সময় তাদের চ্যানেলগুলোর অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে বলে জানা যায়।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্প্রচারে আনতে না পারার নীতিমালা লঙ্ঘন করায় তাদের চ্যানেল দুটির অনুমোদন বাতিল হবে কী না, এ প্রশ্নও অনেকের। গত বছরের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ওই দুটি চ্যানেল সম্প্রচারে আসছে না, বিষয়টি এমন নয় বলেই মনে করছেন গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। কারণ, অনুমোদন পাওয়ার পর প্রায় আট বছর ক্ষমতায় ছিল রাশেদ খান মেননের দল। একইসঙ্গে ওই সরকার সৈয়দ শামসুল হকের পরিবারের প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিল। এরপরও টিভি চ্যানেল দুটি সম্প্রচার শুরু করতে পারেনি।
দীর্ঘ বছরের মধ্যে সম্প্রচারে আনতে না পারলেও কেন তারা টিভি চ্যানেলের অনুমোদন নিয়েছিলেন, এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের। প্রচলিত নীতিমালা উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত সরকার কেন ওই দুটি টিভির অনুমোদন দিয়েছিল, এ প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার শুরু হওয়ার কোনো বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে না। মালিকপক্ষের নেই এ বিষয়ে আগ্রহ। সম্প্রচার শুরু করার কোনো কোনো ধরনের প্রস্তুতি নেয়নি তারা। রাশেদ খান মেনন গত বছরের ২২শে আগস্ট গ্রেপ্তার হয়ে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আছেন। তার পরিবারের সদস্যরাও আত্মগোপনে। সৈয়দ শামসুল হকের পরিবারও বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রকাশ্যে নেই।
মেনন ও সৈয়দ হক ২০১৭ সালের শুরুতে তাদের আবেদন অনুযায়ী বেসরকারি দুটি টিভি চ্যানেলের অনুমোদন পান। ওই বছরের জানুয়ারিতে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করে তাদের চ্যানেলগুলোর অনুমোদন পাওয়ার কথা জানায় সরকার। এর মধ্যে রয়েছে প্রয়াত লেখক সৈয়দ হকের ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হকের 'আমার টিভি' এবং ওই সময়ের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী মেননের 'খেলা টিভি'৷
তথ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র সুখবর ডটকমকে জানায়, আমার টিভি'র অনুমোদনের জন্য মূলত আবেদন করেছিলেন কবি সৈয়দ হক। চূড়ান্ত অনুমোদন হওয়ার আগে ২০১৬ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৭ সালে কবির ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হকের নামে আমার টিভির অনুমোদন হওয়ার কথা প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায় সরকার। ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’- শিহরণজাগানিয়া এ অমর আহ্বানের স্রষ্টা সৈয়দ হক আওয়ামী লীগের সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন।
অভিযোগ আছে, মালিক হিসেবে টিভি চ্যানেল স্থাপন ও পরিচালনার সক্ষমতা নেই মেনন এবং সৈয়দ হকের পরিবারের। এমনকি এ বিষয়ে তেমন অভিজ্ঞতাও ছিল না তাদের। রাজনৈতিক আনুগত্য ও যোগাযোগের কারণেই তারা নিবন্ধন পান। নিবন্ধন নিয়ে মেনন উচ্চমূল্যে অন্তত দশজন ব্যবসায়ীর কাছে মালিকানা বিক্রি করেছেন। বিক্রির আগে এ বিষয়ে তিনি সরকারের অনুমতিও নেননি। একাধিক উপায়ে চেষ্টা করেও এ বিষয়ে মেনন ও সৈয়দ হকের পরিবারের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
তবে নীতিমালার লঙ্ঘন হলেও আলোচ্য চ্যানেল দুটির অনুমোদন বাতিলের চিন্তা আপাতত নেই বলে সুখবরকে জানিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র। ২০১৩ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে জমা দেওয়া হলফনামায় মেনন দাবি করেছিলেন, টেলিভিশনের টক-শোতে অংশ নিয়ে প্রতি মাসে তার আয় হয় এক লাখ টাকা। টক-শো তার আয়ের 'অন্যতম উৎস' বলে দাবি করেন ওই সময়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মেনন।
তখনো দেশের প্রায় সব বেসরকারি টিভি চ্যানেলে টক-শো প্রচার হত। সমসাময়িক রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে সেগুলোতে আলোচনা করা হত। এতে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিতেন। যদিও ওই সময়ের মন্ত্রী মেনন সার্বিক ব্যস্ততার কারণে টক-শোতে অংশ নেওয়ার সময় খুব কম পেতেন। তাছাড়া টক-শোর সম্মানিও তখন বর্তমানের তুলনায় আরো কম ছিল। ফলে মেননের 'আয়ের অন্যতম উৎস' নিয়ে তখন প্রশ্ন উঠে।
আর মাসে মাত্র এক লাখ টাকা যার আয়, তিনি কীভাবে মালিক হিসেবে টিভি চ্যানেলের এত খরচ যোগাড় করবেন, সেই প্রশ্নও তিনি টিভি চ্যানেলের অনুমোদন পাওয়ার পর আসে। অনেকে মনে করেন, বাস্তবতা ভিন্ন। ক্ষমতায় থাকাকালে মেনন হাজার কোটি টাকা লোপাট করেন বলে অভিযোগ আছে। সেসব 'আড়াল' করতে টিভি চ্যানেলের নিবন্ধন নেন তিনি। আওয়ামী লীগের বিগত সরকারও বাছ-বিচার ছাড়া রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনায় কয়েক ডজন টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দেয়।
১৯৯৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ৫৩টি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে সম্প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪১টি টিভি চ্যানেল সম্প্রচার শুরু করলেও বর্তমানে চালু রয়েছে ৩৪টি। সাতটি চ্যানেল চালুর পর বন্ধ করে দেওয়া হয়।
২০০৫ ও ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারও ১০টি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দিয়েছিল। এগুলো হচ্ছে- বৈশাখী, আরটিভি, বাংলাভিশন, ইসলামিক টিভি, দেশ টিভি, দিগন্ত টিভি, সিএসবি, চ্যানেল ওয়ান, এসএ টিভি ও যমুনা টিভি। এগুলোর মধ্যে ইসলামিক, দিগন্ত, সিএসবি ও চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচার স্থায়ী বা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বিবিসির সাবেক সাংবাদিক কামাল আহমেদ মনে করেন, 'বাংলাদেশে ৪৬টি টেলিভিশন চলার মতো বাজার নেই। অথচ বিগত সরকারের আমলে টেলিভিশন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।'
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, 'টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স পাওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অবস্থানটি মুনাফার অবস্থানে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে লাইসেন্স নিয়ে তা বিক্রি করে দেওয়া একধরনের জালিয়াতি।'
তার মতে, 'টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে দুটি দিক পাওয়া যায়। যারা রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে পারেন, এমন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষমতাবানরাই টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স পাচ্ছেন। আবার গণমাধ্যম খাতে এখন বিনিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ার কারণে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এ ধরনের গণমাধ্যম মৌলিক ভূমিকা পালন করতে পারছে না।'
দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা টিআইবির এ কর্মকর্তা মনে করেন, 'টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়ার নীতিমালায় পেশাদারি বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। লাইসেন্স হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়েও কার্যকর নীতিমালা থাকা উচিত। তা না হলে গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।'
খবরটি শেয়ার করুন