ফাইল ছবি
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১৫ মাস ধরে অভিযোগ গঠন ছাড়াই আটক রয়েছেন। এ পর্যায়ে তাকে এভাবে 'আটক রাখা কেবল আর্বিট্রারি-ই (যথেচ্ছ) নয়, ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব কার্যবিধির অধীনেও খুব সম্ভবত অবৈধ' বলে মনে করেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান।
তিনি বলছেন, বিষয়টি শুধু তৌফিক-ই-ইলাহীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাবেক মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যসহ আরও অন্তত সাতজন অভিযুক্ত রয়েছেন, যারা আইসিটির মাধ্যমে অভিযোগ গঠন ছাড়াই এক বছরের বেশি সময় ধরে আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন দীপু মনি, ফারুক খান, কামাল আহমেদ মজুমদার, শাহজাহান খান, গোলাম দস্তগীর গাজী, ফজলে করিম চৌধুরী ও সাবেক বিচারক শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।
তিনি বলেন, তারাও যদি যথাযথভাবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির লিখিত ব্যাখ্যা ছাড়া এক বছরের তদন্ত সীমার পরেও আটক থাকেন, তাহলে তাদের আটকে রাখা ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব আইনগত কাঠামোর পরিপন্থী বলেই প্রতীয়মান হয়। তার প্রশ্ন, তৌফিক-ই-ইলাহী কেন এখনো আইসিটির হেফাজতে রয়েছেন? আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন ছাড়াই ৮১ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন আটক রাখার মতো কী সেই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি?
যুক্তরাজ্যের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী লর্ড কার্লাইল কেসিও নিঃসন্দেহে তাই মনে করেন বলে জানান বার্গম্যান। লর্ড কার্লাইল কেসি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষের উকিল ছিলেন। বর্তমানে অভিযোগ গঠন ছাড়াই এক বছরের বেশি সময় ধরে আইসিটির মাধ্যমে আটক থাকা আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে সহায়তা করছেন তিনি।
বার্গম্যান উল্লেখ করেন, আমার সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি (লর্ড কার্লাইল কেসি) বলেছেন, ‘তার (ফজলে করিম চৌধুরী) বিরুদ্ধে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, সেটার কোনো আইনি গ্রহণযোগ্যতাই নেই। (আইসিটির প্রসিকিউটরদের) কাছে যদি তার বিরুদ্ধে প্রমাণ থাকে, তাহলে সেটা উত্থাপন করা উচিত ছিল। কিন্তু তারা সেটা করেননি। কোনো সাক্ষ্য, ছবি বা নথি নেই, যেখান থেকে এটা বলা যায় যে তিনি যেসব অভিযোগে অভিযুক্ত, সেগুলোয় তার সমর্থন ছিল।’
ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে ডেভিড বার্গম্যান এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ রোববার (২২শে ফেব্রুয়ারি) ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে 'দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস কুয়েশ্চনেবল ডিটেনশন পলিসি' শিরোনামে। এসব মন্তব্যের বিষয়ে বার্গম্যান জানতে চাইলে আইসিটির প্রসিকিউশন দপ্তর কোনো উত্তর দেয়নি বলে তিনি লেখাটির শেষে উল্লেখ করেন।
ডেভিড বার্গম্যান লেখেন, প্রথম আলোতে ২০২৫ সালের আগস্টে লিখেছিলাম, ২০২৪ সালের অক্টোবরে—অর্থাৎ ১০ মাস আগে—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে। ওই লেখায় আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, শুরুতে কিংবা ১০ মাস পরেও আইসিটির পক্ষ থেকে তার আটক রাখার পক্ষে কোনো প্রামাণ্য ভিত্তি ছিল না।
তিনি বলেন, বর্তমানে আরও ছয় মাস পার হয়ে যাওয়ার পর তৌফিক-ই-ইলাহী পূর্ণ ১৫ মাস ধরে অভিযোগ গঠন ছাড়াই আটক রয়েছেন। এ পর্যায়ে তাকে আটক রাখা কেবল আর্বিট্রারি-ই (যথেচ্ছ) নয়, ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব কার্যবিধির অধীনেও খুব সম্ভবত অবৈধ। আইসিটির কার্যবিধির ৯(৫) ধারায় বলা হয়েছে: তদন্তকালীন কোনো আসামি হেফাজতে থাকলে, বিধিমালার অধীনে গ্রেপ্তারের এক বছরের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত সম্পন্ন করবেন। উপর্যুক্ত নির্ধারিত সময়ে তদন্ত সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আসামিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, তবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল তদন্তের মেয়াদ ও আসামিকে হেফাজতে রাখার আদেশ আরও ছয় মাস পর্যন্ত বাড়াতে পারে। বিধানটির কাঠামো স্পষ্ট। প্রথমত, গ্রেপ্তারের এক বছরের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই সময়সীমার মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে শর্তসাপেক্ষে আসামিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। তৃতীয়ত ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এক বছরের বেশি সময় আটক রাখার অনুমতি কেবল ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’ দেওয়া যেতে পারে এবং লিখিতভাবে যুক্তিসহ সেটা ব্যাখ্যা করতে হবে।
তার মতে, যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, বিধির দ্বিতীয় বাক্যে ব্যবহৃত ‘দেওয়া যেতে পারে’ শব্দগুচ্ছের কারণে ট্রাইব্যুনাল জামিন প্রত্যাখ্যানের এখতিয়ার রাখেন। তবে এই এখতিয়ার তৃতীয় বাক্য দিয়ে স্পষ্টভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, এক বছরের বেশি আটক রাখা যাবে কেবল তখনই, যখন ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিদ্যমান এবং তা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাহলে তৌফিক-ই-ইলাহী কেন এখনো আইসিটির হেফাজতে রয়েছেন? আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন ছাড়াই ৮১ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন আটক রাখার মতো কী সেই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি? প্রকাশ্যে এমন কোনো পরিস্থিতি চিহ্নিত করা হয়নি।
তিনি বলেন, আটকাবস্থায় এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর তৌফিক-ই-ইলাহীর পরিবার জামিন আবেদন করেনি। সম্ভবত পর্যাপ্ত আইনি পরামর্শের অভাবেই সেটা হয়েছে। তবুও যুক্তিযুক্তভাবে বলা যায়, ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব দায়ও রয়েছে। এক বছরের সীমা অতিক্রমের পর কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি না থাকলে নিজস্ব বিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনালের সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল এবং তার মুক্তির আদেশ দেওয়া উচিত ছিল।
কলামিস্ট বার্গম্যান বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে দাবি করা হয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করছেন। এটা সত্য যে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এ গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়েছে, যাতে অপরাধের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তবে আটক-সংক্রান্ত বিধানগুলো পরিবর্তন করা হয়নি এবং অন্তত অভিযোগ গঠনের আগে আটকসংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।
ডেভিড বার্গম্যান লেখেন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী লর্ড কার্লাইল কেসি তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের আইন-ব্যবস্থা ও বর্তমান সরকারকে নিজেদের ঘর গুছিয়ে নিতে হবে। তা না হলে কমনওয়েলথ (দেশগুলোর মধ্যে) সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি অবস্থানে চলে যাবে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাছ থেকে আমরা এমন কিছু প্রত্যাশা করিনি। আমি আরও ভালো কিছু আশা করেছিলাম’।
বার্গম্যান বলেন, নিঃসন্দেহে কিছু গোষ্ঠী যথাযথ এসব প্রক্রিয়া ও আইনের শাসন প্রয়োগে আপত্তি তুলবে। বিশেষত যদি এর মাধ্যমে তাদের ভাষায় ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের জামিন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাইকেই এমন ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। গত ১৮ মাসে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলোর জবাবদিহি নিয়ে আলোচনায় এসব মহলে প্রতিশোধ ও শাস্তির ওপরই অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়েছে। সেখানে ন্যায্যতা, নিরপেক্ষতা ও বিচার প্রক্রিয়ার শর্তের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, তবে ট্রাইব্যুনাল এবং নতুন সরকারকে যেকোনো চাপ প্রতিহত করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলাতেও যথাযথ প্রক্রিয়া বিশ্বস্তভাবে প্রয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এর অর্থ, আইসিটিকে কার্যবিধির ৯(৫) ধারা প্রয়োগ করতে হবে এবং যারা অভিযোগ গঠনের আগে এক বছরের বেশি সময় ধরে আটক আছেন, তাদের জামিন দিতে হবে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না। সেগুলো বরং সমুন্নত রাখার মাধ্যমেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
সবশেষে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনে তার দলের বিজয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বাংলাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব কেবল ‘আইনের শাসন’ দিয়ে। প্রকৃতপক্ষে, তার মায়ের যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাবেক আইনজীবীও এখন ঠিক এ কথাই বলছেন।
খবরটি শেয়ার করুন