ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
একাত্তরের যে দিনটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠের ঘোষণায় স্বাধীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের প্রতিটি প্রান্তে, ইতিহাসের বাঁক বদলে দেওয়া সেই ৭ই মার্চ এবারো এসেছে ভিন্ন বাস্তবতায়।
আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে ৭ই মার্চ উদযাপনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে যে ছেদ পড়ছিল, বিএনপির নতুন সরকারেও তা কাটেনি। খবর বিডিনিউজের।
বঙ্গবন্ধু কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনের মুখে চব্বিশের ৫ই আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে ইতিহাসে সবচেয়ে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে আওয়ামী লীগ।
শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে প্রতিবছরই নানা কর্মসূচিতে পালিত হত জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া দিনটি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ৭ই মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
বদলে যাওয়া বাস্তবতায় ঐতিহাসিক এই দিনে কোনো কর্মসূচির কথা শোনা যায়নি। গত বছর মে মাসে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির নেতাকর্মীরা হয় পলাতক, নয়ত জেলে।
ক্ষমতা হারানোর পর থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকাণ্ড ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ; ৭ই মার্চ ঘিরেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। জাতির মুক্তি সংগ্রামের স্বপ্নে ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে ৫৫ বছর আগের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়ে যান।
তৎকালীন রেস কোর্সের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস ১৯ মিনিটে তুলে ধরে সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
এরপর ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ শুরু করলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি শোষক, দখলদার ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আসে স্বাধীনতা।
৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব বিবেচনায় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো এ ভাষণকে ‘ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজের’ মর্যাদা দিয়েছে।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের নিষ্পেষণ থেকে বাঙালির মুক্তির মূলমন্ত্র ঘোষণা করেন। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা কালো কোট পরে তিনি রেসকোর্সের মঞ্চে আসেন; দাঁড়ান মাইকের সামনে। আকাশ-কাঁপানো শ্লোগান আর মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানান অপেক্ষমান জনসমুদ্রের উদ্দেশে। তারপর শুরু করেন তার ঐতিহাসিক ভাষণ।
কবিতার পংক্তির উচ্চারণের মতো তিনি বলে চলেন- “আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।”
বঙ্গবন্ধু বললেন, “সৈন্যরা, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না।”
রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্র তখন উত্তাল। যেন আরো কিছু শুনতে চায় জনতা। বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করলেন তার শেষ বক্তব্য- “তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব- এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”
মাত্র ১৯ মিনিটের এই ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে তুলে আনেন অবিশ্বাস্য এক উঁচ্চতায়। এতে সামরিক আইন প্রত্যাহার, সৈন্যবাহিনীর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন, শহীদদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের চার দফা দাবি উত্থাপন করেন তিনি।
মূলত বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণের আহ্বানেই মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে বাঙালি। ২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার মধ্যে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভমহানি এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের।
খবরটি শেয়ার করুন