ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাবে ভয়াবহ জনসংখ্যাগত সংকটের মুখে পড়েছে ইউক্রেন। যুদ্ধের ময়দানে প্রাণহানি, জন্মহারের রেকর্ড পতন এবং অসংখ্য মানুষের দেশত্যাগের কারণে দেশটিতে বিধবা ও এতিম শিশুদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা এমন পরিস্থিতিকে ‘জনসংখ্যাগত বিপর্যয়’ হিসেবে অভিহিত করছেন। যুদ্ধের কারণে অনেক নারী মা হওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির ভবিষ্যৎ জনবল ও সামাজিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলেছে। খবর সিএনএনের।
২০১৪ সালে যখন পূর্ব ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ওলেনা বিলোজেরস্কা ও তার স্বামী সন্তান নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দুজনই যুদ্ধে যোগ দেন। তখন তাদের পারিবারিক পরিকল্পনা স্থগিত হয়। সেনাবাহিনী ছাড়ার সময় বিলোজেরস্কার বয়স দাঁড়ায় ৪১ বছর। চিকিৎসকেরা জানান, তার মা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
যুদ্ধের কারণে এমন সিদ্ধান্ত বহু নারীর জীবনে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ইউক্রেনের জন্মহার কার্যত ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় এক কোটি মানুষ দেশটির জনসংখ্যা থেকে হারিয়ে গেছে।
এদের কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ দেশ ত্যাগ করেছেন, কেউ আবার রুশ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বাস করছেন। যদিও যুদ্ধের আগেও ইউক্রেনে জন্মহার কম ছিল, তবে সংঘাতের পর তা নজিরবিহীনভাবে নেমে গেছে।
অন্যদিকে যুদ্ধজনিত চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার প্রভাব পড়ছে প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, গর্ভপাতে জেনেটিক জটিলতা, অকাল মেনোপজ এবং ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মান হ্রাসের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
ফ্রন্টলাইন থেকে ফেরা পুরুষদের ক্ষেত্রেও এ সমস্যা প্রকট। এমনকি যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে ক্লিনিকগুলোকে সংরক্ষিত ভ্রূণ ও শুক্রাণু রক্ষায় বিশেষ দেয়াল নির্মাণসহ কঠিন ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
যুদ্ধের আরেক নির্মম বাস্তবতা হলো পরিবারহীন শিশু ও বিধবার সংখ্যা বৃদ্ধি। ইউক্রেন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের তথ্য প্রকাশ না করলেও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর হিসাবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর এক-দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে।
সেনাদের গড় বয়স তুলনামূলক বেশি হওয়ায় নিহতদের বড় অংশেরই পরিবার ছিল। ফলে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন প্রায় ৫৯ হাজার শিশু জৈবিক অভিভাবক ছাড়া বসবাস করছে, যাদের বেশির ভাগ পালক পরিবারে রয়েছে।
২০২২ সাল থেকে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ শরণার্থী হিসেবে বিদেশে অবস্থান করছে। তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় মেধা পাচারের ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া অনেকেই আর ফিরতে চাইছেন না। বর্তমানে ইউক্রেনের মোট প্রজনন হার নেমে এসেছে একের নিচে, যা ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি বড় ধরনের ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধাপ্রবাহের ক্ষতি তৈরি করছে। তাই যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত কম মানুষ ফিরে আসবে।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন