বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৯শে মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১১:১০ অপরাহ্ন, ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬

#

ফাইল ছবি

চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠন করা হলেও দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে, বা স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না বলে আশঙ্কা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। দেশের প্রাচীনতম এই রাজনৈতিক দলটি আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিষিদ্ধ হওয়ার মধ্যেই আগামী বৃহস্পতিবার (১২ই ফেব্রুয়ারি) ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ মনে করছে, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে এবং তাদের সমর্থকদের ভোট বর্জনের জন্য আবারো আহ্বান জানিয়েছে দলটি। এ বিষয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ব্লুমবার্গকে বলেছেন, বৃহস্পতিবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের অস্থিরতার সমাধান করবে না। নির্বাচনের ফলাফল সর্বদা প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে। এই ফলাফল গ্রহণযোগ্য হবে না।

ব্লুমবার্গের মতে, ২০০৯ সাল থেকে টানা নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার শাসনামলে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছেন। একইসঙ্গে  শেখ হাসিনা সরকার চীন ও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ রেখেছে। দেশের রাজনীতি থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূল করেছে।

তবে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের উপর শেখ হাসিনা সরকারের রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের অভিযোগ সাবেক ওই সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা সুষ্ঠু হয়নি বলে সমালোচনা করেছেন।

শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে গত দেড় বছরে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার একাধিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়াই করছে এবং বাংলাদেশি পণ্যের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পোশাক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এই প্রসঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয় ব্লুমবার্গকে বলেন, 'জনগণ ইতিমধ্যেই স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অভাব বোধ করছেন।' ব্লুমবার্গ প্রতিবেদনে সজীব ওয়াজেদকে 'আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা' হিসেবে উল্লেখ করেছে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা সজীব ওয়াজেদের সঙ্গে ব্লুমবার্গ টেলিফোনের মাধ্যমে কথা বলেছে।

উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সজীব ওয়াজেদ জয় তার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তখন এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে সরকার দাবি করে, সজীব ওয়াজেদ জয়ের নিয়োগ অবৈতনিক ও খণ্ডকালীন।

সজীব ওয়াজেদ জয় ব্লুমবার্গকে বলেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের (সম্ভাব্য) অধীনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে। জামায়াতে ইসলামী ইসলামপন্থি এজেন্ডা এগিয়ে নিচ্ছে। যা নারীদের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করবে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের দিকে পরিচালিত হবে বলে তার আশঙ্কা।

'দেশের অর্থনীতির উন্নতি হবে না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে না, বিশেষ করে একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কারণে মানুষ খুব দ্রুত বিরক্ত হয়ে যাবে', ব্লুমবার্গকে তিনি বলেন।

অদূর ভবিষ্যতে নিজের জন্য সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকার পরিকল্পনা না করা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, আওয়ামী লীগ ইউরোপের সরকার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, যাতে তারা বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের হুমকি সম্পর্কে সচেতন হন।

তিনি বলেন, নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাস্থ্য খুব ভালো। ভারত সরকার তাকে নিরাপত্তা দিয়েছে এবং যতদিন ইচ্ছা দেশটিতে তাকে থাকতে দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, 'এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি মনে করি, ভারতই তার (শেখ হাসিনা) জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা।'

তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন, যার মধ্যে দেশে আত্মগোপনে থাকা বা কারাগারে থাকা কিছু নেতাকর্মীও রয়েছেন, যারা দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। 'তিনি (শেখ হাসিনা) সর্বদা ফোনে ব্যস্ত থাকেন', উল্লেখ করেন সজীব ওয়াজেদ জয়।

'হাসিনাস পার্টি সিস ইনস্ট্যাবিলিটি ইন বাংলাদেশ আফটার ইলেকশনস' শিরোনামে আজ মঙ্গলবার (১০ই ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা  হয়েছে, আওয়ামী লীগ অতীতের নির্বাচনে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ রিজার্ভ ভোট পায়। নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় দলটির অনুপস্থিতিতে বিএনপির মতো দলগুলো এখন সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের তাদের পক্ষে টানছে।

জাতিসংঘের মতে, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে তার শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভের ঢেউ সহিংস হয়ে ওঠার পর এবং সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়নের ফলে ১,৪০০ জনেরও বেশি লোক মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন।

সজীব ওয়াজেদ জয় স্বীকার করেছেন যে, শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভ পরিচালনার পদ্ধতিতে কিছু ভুল করেছে। তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোকে 'বৈধ' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও বলেছেন যে, আওয়ামী লীগ সরকার 'সত্যি সত্যিই যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়েছে', যার সুযোগ নিয়ে কিছু বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের সরকারকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ এখন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন দ্বারা শাসিত হচ্ছে। এই সরকার গত বছর জাতীয় নিরাপত্তা এবং ফৌজদারি বিচারে সাক্ষীদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা থেকে নিষিদ্ধ করেছে। ড. ইউনূসের সরকারের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের জন্য ব্লুমবার্গের অনুরোধে সাড়া দেননি।

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার নেয় গত বছরের মে মাসে।

ব্লুমবার্গ বলছে, আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আগামী বৃহস্পতিবারের নির্বাচনকে বিএনপি, যারা শেখ হাসিনার আগে দেশ শাসন করেছিল এবং ছাত্র-সমর্থিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ও দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থির দল জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জোটের মধ্যে প্রতিযোগিতায় পরিণত করেছে।

সজীব ওয়াজেদ জয়

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250