বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৯শে মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটও শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারে’

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৭:৪৫ অপরাহ্ন, ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান বলছেন, গত ১৮ মাসে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান এতটাই নাটকীয় যে, কিছু বিশ্লেষকের মত, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটও শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারে। দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ার সবচেয়ে বেশি আলোচিত ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো দুর্নীতি থেকে তাদের কথিত দূরত্ব। ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেখা গেল, আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রিত অনেক চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক দ্রুতই বিএনপি-সমর্থিত গোষ্ঠীর দখলে চলে গেছে।

তার মতে, বাংলাদেশের প্রকৃত পরিবর্তন প্রত্যাশী ভোটারদের কাছে এই ধারণাকে আরও শক্ত করেছে—বাস্তবে বিএনপি তার পূর্বসূরি আওয়ামী লীগের চেয়ে খুব একটা আলাদা না। গ্রামীণ এলাকায় ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াও মুখোমুখি প্রচারে জামায়াত বড় ধরনের শক্তি বিনিয়োগ করেছে। এটা বড় সমাবেশ বা গণমাধ্যমনির্ভর প্রচারণার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে ভোটের বাক্সে।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকে দণ্ডিত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া অর্থাৎ তাদের বিচার হওয়া, বিএনপি-জামায়াতের সততার ভাবমূর্তিতে তুলনায় জামায়াতের এগিয়ে থাকা, দলটির কল্যাণমূলক রাজনীতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, মধ্যপন্থী ও নমনীয় অবস্থান উপস্থাপন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হওয়া, ভারতবিরোধী মনোভাব এবং ‘পরিবর্তনের’ দল হিসেবে জামায়াত—এরকম সম্ভাব্য আটটি কারণে দলটি এগিয়ে আছে বলে ব্যাখ্যা করেন বার্গম্যান।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতের কৌশলের অন্যতম ভিত্তি—দাতব্য, দৃশ্যমান ও সংগঠিত কল্যাণমূলক রাজনীতি। আর এখনো উল্লেখযোগ্য হারে রাজনৈতিক সুনাম কুড়িয়ে চলেছে। জামায়াতের বর্তমান গতি সত্যিই বিস্ময়কর। তাই দলটিকে সমর্থন করা উচিত—এমন ইঙ্গিত না দিয়ে, কিংবা তাদের যৌক্তিক সমালোচনা এড়িয়ে না গিয়েও প্রশ্ন ওঠে—তাদের দ্রুত উত্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

তার মতে, মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের ভূমিকা আর রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য করে দেওয়ার মতো বিষয় হিসেবে ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে বিবেচিত হচ্ছে না। এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। একাত্তরের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের শাসনামলে দণ্ডিত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। ফলে বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে ওই ঘটনাগুলোর সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই।

ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে লেখা এক নিবন্ধে ডেভিড বার্গম্যান এসব কথা বলেন। তার লেখাটি গত রোববার (৮ই ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত হয়, 'এইট রিজনস দ্যাট এক্সপ্লেইন দ্য রাইজ অব জামায়াতে ইসলামী' শিরোনামে। এর পরদিন সোমবার লেখাটির অনুবাদ করে ডেইলি স্টারের বাংলা সংস্করণের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সাংবাদিক বার্গম্যান বহু বছর ধরে বাংলাদেশ নিয়ে লিখে আসছেন।

বার্গম্যান ডেইলি স্টারের নিয়মিত কলাম লেখক। তার লেখা নিবন্ধ পত্রিকাটির ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত হলেও কখনোই এর বাংলা অনুবাদ করে প্রকাশ করেনি ডেইলি স্টার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের তিনদিন আগে তার লেখাটির অনুবাদ প্রকাশ করে জামায়াতের পক্ষে ডেইলি স্টার জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অনেক নেটিজেনের অভিযোগ।

অবশ্য বার্গম্যানের নিবন্ধের নিচে ডেইলি স্টারের ঘোষণা ঝুলছে, 'দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।'

নিজের নিবন্ধে ডেভিড বার্গম্যান বলেন, শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অপ্রত্যাশিত পরিণতিগুলোর একটি হলো গত ১৮ মাসে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন দ্রুত বেড়ে যাওয়া। সাম্প্রতিক জরিপ অনুসারে, ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে—এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবুও এই ইসলামপন্থী দলটির উত্থান এতটাই নাটকীয় যে, কিছু বিশ্লেষকের মত, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটও শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারে।

তিনি বলেন, এই পরিবর্তনের ব্যাপকতাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা উচিত নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছরগুলোতে জামায়াত এতটাই কোণঠাসা ও দমন-পীড়নের শিকার ছিল যে, দলটি কার্যত একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে স্বাভাবিক কাজও করতে পারছিল না। তাদের অনেক শীর্ষ নেতা কারাবন্দী ছিলেন। দলটি কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে প্রায় গোপন অবস্থায় কার্যক্রম চালাতো।

বার্গম্যান বলেন, জামায়াত কর্মীরা দল থেকে অর্থ নেওয়ার বদলে উল্টো দলকেই অর্থ দেন। তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের পথ হিসেবে দেখা হয় না। আর এই পার্থক্যটি হতাশ ভোটারদের একটি অংশের কাছে প্রবল সাড়া ফেলেছে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শত শত পরিবার স্বজন হারানোর শোকে আচ্ছন্ন ছিল। হাজারো পরিবার গুরুতর আহতদের সেবাযত্নে ব্যস্ত ছিল। জামায়াত পরিকল্পিতভাবে এসব পরিবারকে চিহ্নিত করে এবং সম্ভব হলে সরাসরি সহায়তা দিতে উদ্যোগী হয়।

তিনি লেখেন, খবর অনুযায়ী, প্রতিটি শহীদ পরিবারকে অন্তত এক লাখ টাকা করে এবং বহু আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে গিয়ে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জামায়াতের এই উদ্যোগ তাদের একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন হিসেবে ভাবমূর্তিকে আরও জোরাল করেছে, যারা নিজেদের সম্পদকে বাস্তব সহায়তায় কাজে লাগাতে সক্ষম।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে গতি-প্রকৃতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। যেসব ভোটার আগে আওয়ামী লীগকে রুখতে বিএনপিকে সমর্থন করতেন, তারা এখন হয়তো আরও স্বাধীনভাবে জামায়াতকে ভোট দিতে পারবেন। তাদের এই উদ্বেগও থাকছে না যে, তাদের ভোট অসাবধানতাবশত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে পারে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ও শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয়-পরবর্তী সময়ে কথিত ভারতীয় ‘প্রভাবশালী ভূমিকার’ বিরুদ্ধে জনরোষ আরও তীব্র হয়। অনেকেই এসব মতামত প্রকাশে আগের চেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এই প্রেক্ষাপটে কিছু ভোটার জামায়াতকে বিএনপির তুলনায় ভারতীয় প্রভাব প্রতিরোধে আরও বিশ্বাসযোগ্য শক্তি হিসেবে দেখতে পারেন।

ডেভিড বার্গম্যান বলেন, কারণ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিএনপিকে সাধারণত বেশি বাস্তববাদী এবং কম সংঘাতমুখী বলে মনে করা হয়। ফলে, যাদের কাছে ভারত বিরোধিতা একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বিষয়, তাদের কাছ থেকে জামায়াত অতিরিক্ত সমর্থন পেতে পারে।

ডেভিড বার্গম্যান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250