ছবি: ডয়চে ভেলে
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিশেষ করে তুলেছে তিনটি বিষয়। সেগুলো হলো: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান, বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উত্থান এবং নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের কার্যত ছিটকে পড়া—যা ২০২৪ সালের আগস্টের আগে ছিল কল্পনাতীত।
তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকা। দলটি নিষিদ্ধ হয়নি, তবে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এবং গত ৫৫ বছর ধরে দেশের রাজনীতির অন্যতম অংশ থাকা দলটি কীভাবে নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়ার মতো দুর্বল হলো?
'পলিটিশিয়ানস মাস্ট বি ওপেন টু একসেপ্টিং ইলেকটোরাল ডিফিটস' শিরোনামে ডেইলি স্টারে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। তার লেখাটি গতকাল শুক্রবার (৬ই ফেব্রুয়ারি) পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে।
উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম লেখেন, আওয়ামী লীগের এই বিপর্যয়ের পেছনে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমসহ নানা কারণ রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হলো তাদের শাসনামলের শেষ ছয় সপ্তাহে ঢাকাসহ সারাদেশে চালানো নির্মম হত্যাকাণ্ড। আবু সাঈদের ঘটনাটিই ধরুন না। অন্য আন্দোলনকারীদের থেকে দূরে একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র এক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করা হলো। অথচ, সে অন্য কারো জন্য তো নয়ই, পুলিশের জন্যও কোনো হুমকি সৃষ্টি করেনি। পুরো জাতি সেই ঘটনা দেখেছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ও তার সরকার নিষ্ঠুর নিপীড়কের মানসিকতা দেখিয়েছে এবং জনগণ, বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা সবই হারিয়েছে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়, যখন দুঃখ প্রকাশ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে হাসিনা সরকার একাধিকবার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কারসাজি করে এবং ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে হত্যাকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণের চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হয়। এরই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের ভোটাররা কোন দলের দিকে ঝুঁকবেন, সেটা সম্ভবত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে।
মাহফুজ আনাম লেখেন, এই নির্বাচনের আরেকটি বাড়তি বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয় পার্টির ম্লান হয়ে যাওয়া। জেনারেল এইচ এম এরশাদের শাসনামলে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল দলটি। এরপর প্রতিটি নির্বাচনে অন্তত তৃতীয় অবস্থান ধরে রেখেছিল।
তিনি বলেন, একটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন। তবে আমাদের আসন্ন নির্বাচনটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশে জরুরি ভিত্তিতে স্থিতিশীলতা, মবতন্ত্রের অবসান, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আর এর সবই হতে হবে নির্বাচিত সংসদ, জবাবদিহিমূলক সরকার, দক্ষ নীতিনির্ধারক এবং আমরা কোন পথে এগোচ্ছি—সে বিষয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।
তিনি লেখেন, শেষ করতে চাই সতর্কবার্তা দিয়ে। ইতিহাস বলে, আমরা নির্বাচনের বিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহী হলেও পরাজয় মেনে নিতে ভীষণ অনিচ্ছুক। পরাজিতদের দুটি শ্রেণি—প্রার্থীর পরাজয় এবং সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন না পেয়ে দলীয় পরাজয়। সাধারণত দল সরকার গঠন করতে না পারলেই পুরো নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেও সব নির্বাচনে আমরা এমনটিই দেখেছি। আমরা আগেও লিখেছিলাম, ‘আমরা জিতলে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু, আর হারলে কারচুপি’—এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা, ফলাফল যাই হোক মর্যাদা ও সৌজন্যের সঙ্গে তা যেন গ্রহণ করা হয়। তথ্যভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো উত্থাপন করুন। অযথা বিশৃঙ্খলা ও বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন না। দেশকে দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে নিতে দিন। আমরা রইলাম অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশায়।
খবরটি শেয়ার করুন