বৃহস্পতিবার, ২৬শে মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গোলাম রাব্বানীকে সাদিক কায়েমের টেক্সট, স্ক্রিনশট ফাঁস *** ‘আমরা এখন পাকিস্তানি কায়দায় বাংলাদেশি’ *** মিথ্যা ও অপতথ্য ঠেকাতে নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা *** দৌলতদিয়ায় ফেরিতে উঠতে গিয়ে বাস নদীতে, হতাহতের শঙ্কা *** কর্মক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ সাংবাদিক যৌন হয়রানির শিকার: জরিপ *** সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি নির্দেশনা *** কুমার শানুর সঙ্গে সম্পর্ক স্বীকার, বিয়ে করতে চান ৬২ বছর বয়সি কুনিকা *** রান্নার সঙ্গে নারীর যে কোনো নাড়ির সম্পর্ক নেই, তা মানুষ জানুক: তসলিমা নাসরিন *** ইরানের ‘পানি অস্ত্র’ ব্যবহারের হুমকিতেই কি পিছিয়ে গেলেন ট্রাম্প *** স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করলেন প্রধানমন্ত্রী

‘আমরা এখন পাকিস্তানি কায়দায় বাংলাদেশি’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১১:২৪ অপরাহ্ন, ২৫শে মার্চ ২০২৬

#

ফাইল ছবি

আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ ১৬ জনকে ২০২৫ সালের আগস্টে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) একটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিতে গেলে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ওই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজক ছিল ‘মঞ্চ ৭১’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকারের সময়কার গ্রেপ্তারের অভিজ্ঞতা নিয়ে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানালেন। তিনি বলেন, সেই সময় তিনি হয়রানি, লাঞ্ছনা এবং আটকের শিকার হন। তবে এই অভিজ্ঞতাকে তিনি নেতিবাচকভাবে দেখেননি। বরং তার বক্তব্যে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি ফুটে ওঠে।

তিনি বলেন, “ইউনূস সরকারের আমলে মঞ্চ ৭১ ঠিক জায়গায় প্রত্যাঘাত করেছিল বলেই আপনাকে (উপস্থাপক মঞ্জুরুল আলম পান্না) কারাগারে যেতে হয়েছিল, আমি কয়েকদিন কারাগারে থেকেছি। আমি এতে আনন্দ অনুভব করি।”

তার এই বক্তব্যে একটি রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয়—তিনি মনে করেন, তার কর্মকাণ্ড ছিল জাতির স্বার্থে এবং সেই কারণে শাস্তি ভোগ করাও তার কাছে গৌরবের বিষয়। তিনি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, “আমি মনে করি, ইউনূসের আমলে জাতির জন্য সঠিক কাজটিই করেছি।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মঞ্জুরুল আলম পান্নার পরিচালিত মানচিত্র ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে প্রবীণ রাজনীতিবিদ আবদুল লতিফ সিদ্দিকী এসব কথা বলেন। তার এই মন্তব্যকে ঘিরে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে “আমরা এখন পাকিস্তানি কায়দায় বাংলাদেশি” শীর্ষক তার বক্তব্য।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, বরং দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাসচর্চা এবং রাষ্ট্রচিন্তার দিকনির্দেশনা নিয়েও গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। সাক্ষাৎকারে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক পথে হাঁটছে, যেখানে পাকিস্তানি ধাঁচের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান ফিরে আসছে।

তার মতে, এটি কেবল রাজনৈতিক আচরণে নয়, ভাষার ব্যবহারেও প্রতিফলিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা এখন পাকিস্তানি কায়দায় বাংলাদেশি। আমাদের এখানে শব্দও পরিবর্তন হয়েছে। আজকাল অনেকে ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘বয়ান’ বলছি। এভাবে শব্দ প্রয়োগ একটা হীন প্রচেষ্টা।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত ভাষাগত পরিচয়ের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে সাংস্কৃতিকভাবে মূল সংস্কৃতি থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল শক্তি ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির স্বকীয়তা। সেই জায়গা থেকে আজ যদি শব্দচয়নেও পরিবর্তন আসে এবং তা যদি একটি ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিফলন হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়।

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী তার বক্তব্যে দেশের শাসনব্যবস্থা ও নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা—কেউই লুটেরাদের দমন করতে পারেননি। তার এই মন্তব্য বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কঠিন বাস্তবতাকে সামনে আনে, যেখানে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন। এই বক্তব্যে একদিকে যেমন রাজনৈতিক সংশয় প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার প্রসঙ্গেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাননি, বরং সসম্মানে তিনি সেখানে গেছেন। এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে কিছুটা ভিন্নধর্মী, কারণ বিরোধী পক্ষ থেকে প্রায়ই “পলায়ন” শব্দটি ব্যবহার করা হয়। লতিফ সিদ্দিকীর এই বক্তব্য তাই রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ভিন্নতা এবং ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই প্রসঙ্গে তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য হলো ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন নিয়ে। তিনি দাবি করেন, এই আন্দোলনকে পরে কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। তার ভাষায়, “২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে যারা পরে বগলদাবা করেছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মন থেকে একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা ও মিথ্যা ছড়ানো।”

তিনি আরও বলেন, “চব্বিশকে মুক্তিযুদ্ধের উপরে স্থান দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইয়ের আন্দোলনকারীদের এক করে দেখার চেষ্টা চলছে। অনেকে এতে আনন্দ পান।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, তার এই বক্তব্য দেশের ইতিহাসচর্চা ও রাজনীতির একটি জটিল দিককে সামনে আনে। একটি নতুন আন্দোলন বা রাজনৈতিক ঘটনা যখন জাতীয় ইতিহাসে জায়গা করে নেয়, তখন তা পুরনো ইতিহাসের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে—এটি সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। লতিফ সিদ্দিকীর মতে, এখানে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা কাজ করছে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বকে খাটো করে নতুন ঘটনাকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তার বক্তব্যে মূলত তিনটি বড় থিম স্পষ্ট হয়ে ওঠে—প্রথমত, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিবর্তন; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা; এবং তৃতীয়ত, ইতিহাসের পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা।

সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তার উদ্বেগ নতুন নয়। বিশ্বায়নের যুগে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর বহিরাগত প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেই প্রভাব একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি প্রভাবের বিষয়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল, কারণ দেশটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার প্রসঙ্গে তার মন্তব্যগুলোও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এলেও দুর্নীতি, লুটপাট ও প্রশাসনিক দুর্বলতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। এই বাস্তবতা জনগণের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি করেছে, যা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়েছে।

ইতিহাসের পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। একটি জাতির পরিচয় অনেকাংশেই নির্ভর করে তার ইতিহাসের ওপর। সেই ইতিহাস যদি পরিবর্তিত বা বিকৃত করা হয়, তবে তা জাতীয় পরিচয়ের ওপরও প্রভাব ফেলে। লতিফ সিদ্দিকীর আশঙ্কা, বর্তমান সময়ে সেই ধরনের একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে, “আমরা এখন পাকিস্তানি কায়দায় বাংলাদেশি”—বক্তব্যটি কেবল একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ও ঐতিহাসিক উদ্বেগের প্রতিফলন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার ৫০ বছরেরও বেশি সময় পরেও বাংলাদেশের সামনে অনেক মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে—আমরা কারা, আমাদের পরিচয় কী, এবং আমরা কোন পথে এগোতে চাই।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা সহজ নয়। তবে এ ধরনের আলোচনাই হয়তো আমাদের সেই উত্তর খোঁজার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250