ছবি: সংগৃহীত
মানুষের বিপদে-আপদে যিনি সবার আগে ছুটে যেতেন, আজ তার নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়ে নেমে এসেছে নির্মম অসহায়ত্বের এক করুণ চিত্র। শিশু সাহিত্যিক, ছড়াকার ও গবেষক বকুল হায়দারের (এসএম খালেকুজ্জামান) নিথর দেহ পড়ে আছে ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালের মর্গে—শুধু বকেয়া বিল পরিশোধ না হওয়ার কারণে।
গত ২৪ মার্চ, বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৬২ বছর বয়সী এই সাহিত্যিক (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন ধরে লিভার জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পরও নানা শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন। সর্বশেষ উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারতের চেন্নাইয়ে যান। কিন্তু সেখানেই থেমে যায় তার জীবনের পথচলা।
পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ৬ মার্চ তাকে চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া হয়। শ্বাসকষ্ট, রক্তবমিসহ জটিলতা বাড়তে থাকে। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হয়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু মৃত্যুর পরও যেন শেষ হয়নি তার দুঃখগাঁথা।
হাসপাতালের বিল জমেছে প্রায় ২৬ লাখ রূপি। এই বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় তার মরদেহ এখনো হাসপাতালের মর্গে আটকে রয়েছে। পরিবারের পক্ষে এ অর্থ জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রিয়জনের লাশ দেশে ফিরিয়ে এনে দাফন করার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
এক সময় যিনি মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিজের সামর্থ্য, পরিচিতি, যোগাযোগ—সবকিছু উজাড় করে দিতেন, সেই মানুষটির পরিবার আজ অসহায়ের মতো হাত বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সমাজের কাছে।
বকুল হায়দার ছিলেন শুধু একজন লেখক নন—ছিলেন এক মানবিক হৃদয়ের মানুষ। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তার ছড়া ও শিশু সাহিত্য পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ‘আকাশের টিপ’, ‘রঙের মানুষ’, ‘এইদিন সেইদিন’, ‘পাথর বাড়ির নীল রহস্য’—তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন, গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব পাঠকসমাজ।
পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী। কিন্তু দীর্ঘদিনের ব্যয়বহুল চিকিৎসা তাকে আর্থিকভাবে একেবারে নিঃস্ব করে দেয়। সহায়-সম্পদ বিক্রি, আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা—সবকিছু মিলিয়েই চলছিল তার চিকিৎসা। তবুও আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লাগে এমন কোনো পথ তিনি বেছে নেননি। কারো কাছে হাত পাতেননি কখনো।
আজ তার সেই আত্মমর্যাদাবোধ যেন আরও বেশি করে নাড়া দিচ্ছে সমাজকে। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। কিন্তু তাদের চোখে এখন শুধু অসহায়ত্বের অশ্রু। প্রিয় মানুষটির লাশ দেশে এনে শেষ বিদায় দেওয়ার আকুতি নিয়েই দিন গুনছেন তারা।
পরিবারের পক্ষ থেকে দেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সংস্থা, সরকারি কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং বিত্তবান ব্যক্তিদের কাছে জরুরি আর্থিক সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে। মানবিক বিবেচনায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সহযোগিতা পাঠানোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর-২১২৫২১৪০০৫৪৬৯, প্রাইম ব্যাংক লি:, বসুন্ধরা শাখা, ঢাকা। বিস্তারিত তথ্যের জন্য যোগাযোগ: মোহাম্মদ ইমতিয়াজ: ০১৭৩১৩১৮১২৩ (বকুল হায়দারের শ্যালক)।
একজন মানুষ, যিনি সারাজীবন অন্যের দুঃখ লাঘবে নিজেকে নিবেদন করেছিলেন—তার শেষ যাত্রা কি তবে এমনই অনিশ্চয়তা আর অবহেলার মধ্যে আটকে থাকবে? এই প্রশ্ন এখন শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো সমাজের।
খবরটি শেয়ার করুন