ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে গভীর সংকট তৈরি করেছে, আর এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশ তার মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতেই দেশে জ্বালানি ঘাটতির আশঙ্কা দ্রুত বেড়ে উঠেছে।
আজ বুধবার (১ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ইনডিপেনডেন্ট’ আশঙ্কা করেছে, ইরান যুদ্ধের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বের প্রথম তেল শেষ হয়ে যাওয়া দেশ হতে পারে বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়—রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে জ্বালানি সংকটের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। অনেক মোটরসাইকেল চালক ও পরিবহনকর্মী ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সীমিত পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করছেন।
কেউ কেউ আবার খালি হাতে ফিরছেন, কারণ পাম্পে জ্বালানি ফুরিয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতেও যানবাহনের সংখ্যা কমে এসেছে।
এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা। পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে সংযোগকারী এই পথ দিয়ে এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে এই পথ আংশিকভাবে বন্ধ থাকায় তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেছে এবং সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে সরকার জ্বালানি রেশনিং চালু করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া ডিজেল বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নির্দেশনা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপের কথাও ভাবা হচ্ছে। ঈদুল ফিতরের সময় সাময়িকভাবে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী—বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় একমাত্র শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’-এ মজুত অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ খুবই সীমিত। এই পরিমাণ তেল দিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের মতো চাহিদা মেটানো সম্ভব। একইভাবে ডিজেল ও অকটেনের মজুতও দ্রুত কমে আসছে। মার্চের শুরুর হিসাব অনুযায়ী, ডিজেলের মজুত ছিল মাত্র ৯ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো।
এই পরিস্থিতিতে সরকার নতুন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুরোধও জানানো হয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘পেট্রোবাংলা’ উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে বাধ্য হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি আগের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি দামে এলএনজি সংগ্রহ করেছে। একইভাবে ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন’ বিদেশি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সীমিত পরিমাণ ডিজেল সংগ্রহ করছে, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো দেশ এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’-এর বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে, লোডশেডিং বাড়বে এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
সরকার যদিও দাবি করছে দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই, তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। পেট্রল পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের ওপর ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হামলার ঘটনাও ঘটছে। একই সঙ্গে কালোবাজারি ও সিন্ডিকেটের কারণে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এদিকে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় অনেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করছেন, যা সংকটকে আরও তীব্র করছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞতা এই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত রূপান্তর—এসব পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি ‘হোম-অফিস’ বা ‘বাড়ি থেকে কাজ’-এর মতো ব্যবস্থা চালু করে জ্বালানির ব্যবহার কমানোর পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বাংলাদেশ সত্যিই এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে যেখানে জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রায় স্থবির করে দেবে। এই বাস্তবতা এখন আর শুধু আশঙ্কা নয়—বরং ক্রমেই তা সম্ভাব্য বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন