ফাইল ছবি
জরুরি অবস্থার বিতর্কিত এক-এগারোর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ২০০৭ সালের মার্চের শুরুর দিনগুলোতে নাটকীয় এক ঘটনার কথা সামনে এনেছেন দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তার দাবি, গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান তাকে টেলিফোন করে গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্তের বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন।
আজ বুধবার ‘এক-এগারোর দুঃসময় ভোলা যাবে না’ শিরোনামে নিজের লেখা এক মন্তব্য প্রতিবেদনে মাহমুদুর রহমান এ তথ্য প্রকাশ করেন। বিষয়টি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মাহমুদুর রহমান লিখেছেন, তৎকালীন সরকার ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা (বাংলাদেশ) চলাকালে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে। এর কয়েক দিন আগে তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। ওই ফোনালাপের ব্যবস্থা করে দেন তারেক রহমানের তৎকালীন ব্যক্তিগত সচিব (পিএস), বর্তমানে সরকারি দলের হুইপ নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু।
ফোনালাপে তারেক রহমান জানান, সেনাসমর্থিত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাকে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—একটি হলো দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যাওয়া, অন্যটি কারাবরণ করা। এ পরিস্থিতিতে তিনি মাহমুদুর রহমানের কাছে আন্তরিক পরামর্শ চান।
জবাবে মাহমুদুর রহমান তাকে একটি মৌলিক প্রশ্ন করেন—তিনি কি তার বাবা-মায়ের মতো দেশের জন্য রাজনীতি করতে চান? উত্তরে তারেক রহমান ‘হ্যাঁ’ বললে, মাহমুদুর রহমান তাকে দেশেই থেকে সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নেওয়ার পরামর্শ দেন।
মাহমুদুর রহমান তার লেখায় উল্লেখ করেন, পরে তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের খবর পেয়ে তিনি নিজের ওই পরামর্শের জন্য গভীর অনুশোচনায় ভুগেছেন। বিশেষ করে ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর রাজধানীর পিজি হাসপাতালে তারেক রহমানকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দেখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
তিনি লিখেছেন, সেদিন কবি ও লেখক ফরহাদ মজহারকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে স্ট্রেচারে শায়িত অবস্থায় তারেক রহমানকে দেখেন। সেই দৃশ্য তাকে দীর্ঘ সময় তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। পরে তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন।
তবে সময়ের পরিক্রমায় পরিস্থিতির ভিন্ন মূল্যায়ন করেছেন মাহমুদুর রহমান। তার ভাষ্য, আজ যখন তারেক রহমান দেশের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তখন মনে হয়—সেদিনের পরামর্শটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও একজন রাজনীতিবিদের বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনের পথে তা সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল।
মাহমুদুর রহমান তার লেখায় এক-এগারোর সময়কাল নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার মতে, সেই সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ের সূচনা হয়েছিল। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিষ্ঠানই সেই প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার শাসনামল সেই ধারাবাহিকতারই অংশ ছিল। তার ভাষায়, জিয়া পরিবারের ওপর যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত কঠোর ও পরিকল্পিত।
তবে প্রতিশোধের প্রশ্নে তিনি সংযত অবস্থান তুলে ধরেন। তার মতে, জিয়া পরিবারের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়া হবে কি না—সেটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ক্ষমার সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও তিনি মত দেন।
মাহমুদুর রহমানের এই বক্তব্য নতুন করে এক-এগারো পর্বের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সিদ্ধান্ত এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংকটময় মুহূর্তে নেওয়া ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কীভাবে ইতিহাসের গতিপথে প্রভাব ফেলে—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন