ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় সরকার বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে। বিদ্যমান দামে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চলতি অর্থবছরের জুন পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে বলে প্রাথমিকভাবে হিসাব করেছে অর্থ বিভাগ।
এই অর্থ জোগাড়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র সুখবর ডটকমকে এসব তথ্য জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৭ ডলার থেকে ১০০ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে এলএনজির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ১০-১২ ডলার থেকে ২০-২২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে গিয়ে সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৬৫ লাখ ৬৩ হাজার টন পরিশোধিত এবং ১৪ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯১ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে পেট্রোবাংলার হিসাবে, একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেট থেকে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা।
বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যে দ্বিগুণ দামে কয়েকটি এলএনজি কার্গো কিনতে হয়েছে সরকারকে। এতে জ্বালানি খাতে ব্যয়ের চাপ আরও বেড়েছে। তবে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানির দাম বাড়ানো না হলে এই অতিরিক্ত ব্যয় সরকারকেই বহন করতে হবে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ইতোমধ্যে নির্ধারিত হওয়ায় নতুন করে বড় অঙ্কের ব্যয় বহনের সুযোগ সীমিত। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির অর্থ পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়, যা দেশের ডলার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে নিজস্ব অর্থায়নে বাড়তি ব্যয় মেটানো হলে রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে সরকার আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর দিকে ঝুঁকছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি)। সরকার আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রত্যাশা করছে।
পাশাপাশি এডিবির কাছ থেকে অতিরিক্ত ২৫ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে এবং বিদ্যমান সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির কাছ থেকেও সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
এদিকে, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (বিওপি) রক্ষা করতেও সরকার প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আইএমএফসহ বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।
এর আগে ডলার সংকটের কারণে সময়মতো জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল বাংলাদেশকে। গত বছর বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে এলএনজি আমদানির জন্য ৩৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া হয়, যা পরে আরও বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, অনেক দেশই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ চাইবে। ফলে অর্থ সংগ্রহে প্রতিযোগিতা বাড়বে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এ পরিস্থিতিতে ঋণ পেতে হলে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনসহ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি তুলে ধরা জরুরি।
অন্যদিকে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা যুক্তিসঙ্গত। তবে তা সহজ শর্ত ও কম সুদে হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করে, যার বড় অংশই আসে এলএনজি ও তেল থেকে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন পর্যাপ্ত না হওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার পর গত সাত বছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে এবং এর প্রভাব পড়বে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত অর্থসংস্থান এবং দক্ষ নীতি ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করছে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন