বুধবার, ১লা এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে’ রাজপথে আন্দোলনের ঘোষণা জামায়াত আমিরের *** বাসস সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদের নিয়োগ বাতিল *** মার্চে প্রবাসী আয় এসেছে রেকর্ড ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার *** শেখ হাসিনার রায় বাতিলের দাবি জানিয়ে ট্রাইব্যুনালে যুক্তরাজ্যের ল ফার্মের চিঠি *** শিক্ষামন্ত্রীর এই উদ্ভট চিন্তা কেন? *** লুবাবার বিয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকে আইন অমান্য করেছে: নারীপক্ষ *** যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি-শূন্য প্রথম দেশ হওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ *** যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বোঝা উচিত, বিশ্বে এখন আর তাদের আধিপত্য নেই: ইরানের রাষ্ট্রদূত *** রাজনৈতিকভাবে হয়রানির উদ্দেশ্যে করা প্রায় ২৪ হাজার মামলা প্রত্যাহার হয়েছে: আইনমন্ত্রী *** তারেক রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার আগে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন মাহমুদুর রহমান

শিক্ষামন্ত্রীর এই উদ্ভট চিন্তা কেন?

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০৯:৪৭ অপরাহ্ন, ১লা এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

শংকর মৈত্র

মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে খরচ কমাতে গিয়ে প্রথমেই দৈনিক পত্রিকা রাখা বন্ধ করে দেন। এতে তাদের খরচ বাঁচে সাকুল্যে হয়তো মাসে পাঁচশো টাকারও কম। তাদের হিসাব—পাঁচশো টাকাও তো কমল। অথচ ঘরের অন্য খরচ কিন্তু কমান না। যেমন, সংসারের কর্তা হয়তো হাজার টাকার সিগারেট খান, দামি সুগন্ধি ঠিকই কেনেন, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে মাসে একবার হলেও বাইরে খান। কিন্তু খরচ কমাতে পত্রিকা রাখা বন্ধ।

আমি এটাকে পছন্দ করি না। কারণ পত্রিকা বা খবরের কাগজকে সমাজের দর্পণ বলা হয়। দর্পণ মানে আয়না। আপনি প্রতিদিন একবার হলেও আয়না দেখে ঘর থেকে বের হন। এতে আপনার চেহারা দেখেন, চুল আঁচড়ান, দাঁত দেখেন—আরও কত কিছু! আয়না ছাড়া কোনো ঘর নেই। ঘরের সবচেয়ে জরুরি জিনিস আয়না।

একদিন আয়না না থাকলে কী হতে পারে, ভাবুন তো! অথচ আপনি ঘরের আয়না রাখলেও সমাজের আয়না—খবরের কাগজ—বন্ধ করে দিলেন! কী দুর্বল মানসিকতা আমাদের!

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সমস্যা। আমাদের মতো দেশে এর প্রভাব পড়ে সব মাত্রায়। গরিব রাষ্ট্র, মানুষ বেশি, রাজনৈতিক হানাহানি, লুটপাট—সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। বিদেশি সাহায্য আর ঋণনির্ভর দেশ। অভ্যন্তরীণ সম্পদও নেই। তেলের খনি নেই, গ্যাসের খনি নেই। আছে শুধু জনসংখ্যা।

কিন্তু সেই জনসংখ্যাও দক্ষ নয়। তাদের সম্পদ হিসেবেও গড়ে তোলা যাচ্ছে না। ভয়াবহ বেকারত্ব। আজ নিজেই এক উদাহরণ দেখলাম। ঢাকা মেডিকেলে আউটসোর্সিংয়ে ক্লিনার পদে লোক নেওয়া হবে কয়েকজন। হাজারো আবেদন পড়েছে। এর মধ্যে একজন কর্মকর্তা আবেদনকারীর একটি আবেদনপত্র দেখিয়ে বললেন, মেয়েটি ইসলামিক স্টাডিজে এমএ পাস, বিএসএস করেছে সমাজবিজ্ঞানে।

সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, অথচ একটি ক্লিনারের চাকরিও পাচ্ছেন না। তাও আউটসোর্সিং। এবং এটাও পেতে হয়তো ঘুষ দিতে হবে। (আমি ক্লিনারের চাকরিকে অসম্মান করছি না, কিন্তু আমাদের সমাজের বাস্তবতায় ভাবতে হবে।)

এর কারণ কী? রাষ্ট্রপরিচালকরা কী ভাবেন? সমাজ বিশ্লেষকরা কী ভাবেন?

রাষ্ট্রের প্রথম প্রয়োজন মানুষের কর্মসংস্থান। এই কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে উন্নয়নমূলক প্রকল্প লাগবে, শিল্পায়ন লাগবে। যত বেশি শিল্পায়ন হবে, তত বেশি কর্মসংস্থান হবে। ড. ইউনূস শিল্পায়নবিরোধী লোক। তিনি ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে মানুষকে “পেটে-ভাতে” রাখার তত্ত্বে বিশ্বাসী এবং এ তত্ত্বের জনকও তিনি। গ্রামীণ ব্যাংক গরিবকে গরিব রাখার ব্যাংক। গরিবদের শোষণ করা হয় এর মাধ্যমে।

বিএনপি সরকারের উচিত শিল্পায়নে মনোযোগ দেওয়া এবং ব্যবসাবান্ধব হওয়া। ব্যবসায়ীদের সুযোগ দিন—দেখবেন অর্থনীতি চাঙা হবে। শুধু বিদেশে টাকা পাচার বন্ধ করতে পারেন কি না দেখুন। তাতেই বাজার ঠিক থাকবে। মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা চায়, সুন্দরভাবে বাঁচতে চায়।

যাক, যেটা বলছিলাম। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট নতুন বিএনপি সরকারকে ঝামেলায় ফেলবে। সুযোগসন্ধানীরা নানা সুযোগ নেবে। একটি শ্রেণি সব সময় অপেক্ষায় থাকে—‘কামাই লও’ সুযোগের জন্য। এ মুহূর্তে তেল মজুদ সিন্ডিকেট ‘কামাই লইতাছে’।

এসবের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন—অপ্রয়োজনে বিদ্যুৎ-গ্যাসের অপচয় না করা, সরকারি অফিস-আদালতে এসি বন্ধ রাখা, বিপণিবিতান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখা, গণপরিবহন বাড়িয়ে প্রাইভেট কার কমানো, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিচারকদের গরমে কোট-টাই পরা থেকে বিরত রাখা ইত্যাদি। এতে প্রচুর বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।

কিন্তু এসব না করে সরকার স্কুল-কলেজ একদিন বন্ধ, একদিন চালু রেখে অনলাইনে ক্লাস চালুর কথা ভাবছে বলে জানা যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে সরকারের এমন ভাবনার কথা জানিয়েছেন।

আমি মনে করি, এটি কোনো ভালো সিদ্ধান্ত হবে না। শিক্ষাক্ষেত্রে এটি ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে।

আমরা করোনাকালীন অভিজ্ঞতা ভুলিনি। তখন ছিল মৃত্যু আতঙ্ক। ফলে ভয়ে স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। অনলাইনে মোমের আলোর মতো ক্লাস চালু রাখা হয়েছিল। এর প্রভাব আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে পড়েছে। বাচ্চারা পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়েছে।

কিন্তু জ্বালানি তেলের সংকটে স্কুল-কলেজ বন্ধ দিয়ে অনলাইনে ক্লাস করতে হবে কেন? স্কুলে কি সবাই গাড়ি নিয়ে যায়? সারাক্ষণ কি এসি চলে? সেখানে তো লাইট আর ফ্যানই যথেষ্ট। এমন উদ্ভট চিন্তা শিক্ষামন্ত্রীর মাথায় এলো কেন?

বরং সরকারি অফিসের সময় কমান, প্রাইভেট গাড়ি কমান, শিক্ষামন্ত্রীসহ যারা গরমে কোট-টাই পরেন তারা সেটা পরা বন্ধ করুন। আরও কতভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়! তাই বলে স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেবেন?

শুরুতেই বলছিলাম, খরচ কমানোর জন্য কিছু মানুষ পত্রিকা বন্ধ করে দেন। তারা আসলে সমাজের দর্পণটাই বন্ধ করে দেন। এরা একধরনের মূর্খ ও রুচিহীন মানুষ। একই গোত্রের যারা বিদ্যুৎ বাঁচানোর জন্য স্কুল-কলেজ বন্ধ করে অনলাইনে পড়াশোনা চালু করতে চান। এই সিদ্ধান্ত নেবেন না। বরং অন্য খাতে সীমাবদ্ধতা আনুন, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখুন।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট।

শংকর মৈত্র

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250