ফাইল ছবি
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনি সংস্থা কিংসলি ন্যাপলি শেখ হাসিনার পক্ষে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো এক চিঠিতে এই বিচার প্রক্রিয়াকে “অন্যায্য ও অবৈধ” আখ্যা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিঠির ভাষ্য ও যুক্তিগুলো বিচার করলে স্পষ্ট হয়, বিষয়টি কেবল এক ব্যক্তির মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও এতে জড়িয়ে গেছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারটি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় হয়েছে, যেখানে তার দল আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্টদের ওপর ব্যাপক চাপ ও বৈরী পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, সহিংসতার অভিযোগ এবং আইনজীবীদের হয়রানির ঘটনাগুলো বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
একটি ফৌজদারি বিচার তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি নিরাপদ ও স্বাধীন পরিবেশে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান—এই মৌলিক নীতিই এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে করছে আইন সংস্থাটি।
চিঠির অন্যতম প্রধান যুক্তি হলো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিয়োগ, তাদের পেশাগত যোগ্যতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা—সবকিছুই একটি সুষ্ঠু বিচারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিংসলি ন্যাপলির ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের গঠনপ্রক্রিয়া, বিচারকদের নিয়োগের সময় ও পদ্ধতি এবং তাদের আচরণ এই মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এতে করে পুরো বিচার প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে প্রসিকিউশনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, তৎকালীন প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম আগে যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। বিচার চলাকালে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, প্রসিকিউশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে, প্রসিকিউটরের নিরপেক্ষতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; কারণ তাদের ওপরই নির্ভর করে অভিযোগ উপস্থাপনের বিশ্বাসযোগ্যতা।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিচার চলাকালে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছিল, যা বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কোনো বিচার যদি দুর্নীতির অভিযোগে আচ্ছন্ন হয়, তবে সেটির ফলাফল কতটা ন্যায্য—তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে, শেখ হাসিনার মামলাটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো, শেখ হাসিনাকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি এবং তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এটি একটি মৌলিক অধিকার।
অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনা করা গেলেও, তাকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিতে হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারেননি বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি একতরফা হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে আইন সংস্থাটি।
এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগও উল্লেখ করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং ফ্রিডম হাউস—এই সংস্থাগুলো বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে। যদিও এসব সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বিস্তারিত এখানে তুলে ধরা হয়নি, তবে তাদের উদ্বেগ উল্লেখ করা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিষয়টির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।
চিঠিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন। মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে এর কার্যপরিধি সম্প্রসারণ করে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কিংসলি ন্যাপলির দাবি, এই সম্প্রসারণ ট্রাইব্যুনালের মূল সাংবিধানিক উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে করা হয়েছে এবং এতে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আদালতের এখতিয়ার উপেক্ষিত হয়েছে।
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনার বিষয়টিও চিঠিতে কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে, অনুপস্থিতিতে বিচার বৈধ হতে পারে—তবে সেটি হতে হবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে। এখানে সেই শর্তগুলো মানা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। বরং চিঠিতে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়া “তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ডের সমতুল্য”, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সবশেষে, কিংসলি ন্যাপলি ট্রাইব্যুনালের কাছে কয়েকটি সুস্পষ্ট দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—মৃত্যুদণ্ডের রায় অবিলম্বে বাতিল করা, ভবিষ্যতে বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালনা করা, শেখ হাসিনার আইনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তার অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি, ১৪ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়ার অনুরোধও জানানো হয়েছে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, এই চিঠি শুধু একটি আইনি আপত্তি নয়; বরং এটি দেশের বিচারব্যবস্থার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন