ছবি: সংগৃহীত
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের দাবি, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে মুসলিম পরিচয়ের চেতনা আরও বলিষ্ঠভাবে উন্মেষ হচ্ছে এবং সেই পরিচয়ের সবচেয়ে খাঁটি প্রতিনিধি হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করছে। মধ্যপন্থী দুই দল—মূলত আওয়ামী লীগ এবং কিছুটা বিএনপি—ভোটারদের মনে জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হওয়াই জামায়াতের পুনরুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
তিনি বলছেন, দেশ গণতন্ত্রের পথে আসার পর ১৯৯১ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু, এই দুই দলের শাসন মানুষকে তাদের কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের দুর্নীতিগ্রস্ত, শোষণমূলক ও দমনমূলক ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের শক্ত অবস্থান তৈরির আরও বড় সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ধর্ম ব্যবহারে ধারাবাহিক আদর্শিক অবস্থান, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং তৃণমূল কর্মীদের অবদান জামায়াতের বর্তমান শক্তি অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। বছরের পর বছর ছাত্রলীগের অংশ হয়ে থাকা এবং অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনটির দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বের ভূমিকায় চলে যাওয়ার যে কৌশল তারা নিয়েছে, তা দলটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কার্যকারিতাই প্রমাণ করে।
তার মতে, সম্প্রতি দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের যে বিজয়, তা তাদের সামগ্রিক প্রচেষ্টার সাফল্যেরই প্রমাণ। এটাও জানা যাচ্ছে, তৃণমূলে জামায়াতের নারী কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণায় অত্যন্ত সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখছেন।
'পলিটিশিয়ানস মাস্ট বি ওপেন টু একসেপ্টিং ইলেকটোরাল ডিফিটস' শিরোনামে ডেইলি স্টারে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ শুক্রবার (৬ই ফেব্রুয়ারি) পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে।
উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম লেখেন, 'আসন্ন (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ) নির্বাচনকে বিশেষ করে তুলেছে তিনটি বিষয়। সেগুলো হলো: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান, বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে (বিএনপির চেয়ারম্যান) তারেক রহমানের উত্থান এবং নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের কার্যত ছিটকে পড়া—যা ২০২৪ সালের আগস্টের আগে ছিল কল্পনাতীত।'
তিনি বলেন, জামায়াত বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গণহত্যায় সহায়তা করেছিল এবং আল-বদর ও আল-শামসের মাধ্যমে আমাদের বুদ্ধিজীবী হত্যায় যুক্ত ছিল। সবমিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কারণে সবসময়ই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি গভীরভাবে বিতর্কিত।
তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম হয় এবং এর বিরোধিতা করেছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু ১৯৭১ সালের ঘটনাবলির প্রসঙ্গ টেনে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা এবং সাধারণ ও স্বাধীনতাপ্রেমী মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থানের জন্য ক্ষমা না চাওয়ার যে অনড় অবস্থান, সেটিই সবচেয়ে বেদনাদায়ক।
তিনি বলেন, এমন অতীত নিয়েও আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী হয়ে উঠেছে এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী সংসদে তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এমন লজ্জাজনক অতীত নিয়েও কীভাবে তারা এতটা শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাল?
মাহফুজ আনামের দাবি, একইসঙ্গে জামায়াতের নির্বাচনী মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কথাও উল্লেখ করতে হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উদ্ভূত এই দলটি বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে এসেছিল। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের নিকট ও সুদূর ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন