ছবি: সংগৃহীত
শংকর মৈত্র
বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আর ক্ষমতার লড়াই। কিন্তু এই উত্তাপের ভেতর একটি জনগোষ্ঠী প্রায় প্রতিবারই সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের শিকার হয়—সেটা ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আবারও সেই পুরোনো উদ্বেগ সামনে এসেছে: তারা কি নিরাপদ থাকবে?
ইতিহাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে। কোথাও বাড়িঘর পোড়ানো হয়, কোথাও মন্দিরে হামলা, কোথাও জোর করে জমি দখল কিংবা এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হলেও অপরাধীরা শাস্তির আওতায় আসে না। ফলে সহিংসতা যেন এক ধরনের “নির্বাচনী রেওয়াজে” পরিণত হয়েছে—যা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কল্পনাও করা যায় না।
এবারের নির্বাচন অন্য সব নির্বাচনের চেয়ে ব্যতিক্রম হচ্ছে, ফলে এবার পরিস্থিতি, পরিবেশও ব্যতিক্রম। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যেখানে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই নীতি সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হয় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক সংঘাতের সময় তাদের সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
কারণ তারা সংখ্যায় কম, সামাজিকভাবে তুলনামূলক দুর্বল এবং বিচার পাওয়ার পথে নানা বাধার মুখে পড়ে। নির্বাচনের সময় সহিংসতার একটি বড় কৌশল হলো গুজব রটিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিকে উসকে দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা স্থানীয় পর্যায়ে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়।
এরপর সেই উত্তেজনার সুযোগে হামলা চালানো হয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে। এই সহিংসতা শুধু ব্যক্তি বা পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না—এটি পুরো সমাজে ভয় ছড়িয়ে দেয়। এমন ঘটনা বারবার ঘটছে, কিন্তু প্রতিকার হচ্ছে না। ভয়ের এই পরিবেশ গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর।
কারণ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো নাগরিকের নিরাপত্তা। যখন কোনো মানুষ ভোট দিতে গেলে নিজের জীবন বা পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে, তখন তার ভোটাধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। অনেক সংখ্যালঘু ভোটকেন্দ্রে যেতেই সাহস পান না, আবার কেউ কেউ নির্দিষ্ট পক্ষকে ভোট দিতে বাধ্য হন। এটি কেবল একটি সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়—এটি পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বড়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবশ্যই নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তাকে শুধু রুটিন দায়িত্ব হিসেবে না দেখে বিশেষ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা হিসেবে নিতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগেই চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সেখানে বাড়তি পুলিশ, মোবাইল টিম ও দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সহিংসতা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা এবং কঠোর বিচার। মামলা ঝুলিয়ে রাখা, তদন্তে গড়িমসি কিংবা রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে অপরাধ আরও বাড়ে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এই সহিংসতার চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। তবে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিটি দলের উচিত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা যে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং নিজেদের কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সময় দলীয় স্বার্থে এসব ঘটনা উপেক্ষিত থাকে বা নীরবে প্রশ্রয় পায়। এই নৈতিক ব্যর্থতাই বারবার সহিংসতাকে উৎসাহিত করে।
গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হামলার খবর চাপা না দিয়ে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তুলে ধরা, ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গণমাধ্যমের কাজ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো যদি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলে, তবে অনেক সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামাজিক মানসিকতা। আমাদের সমাজে এখনো অনেক জায়গায় সংখ্যালঘুদের আলাদা চোখে দেখা হয়। এই ভিন্নতাবোধই রাজনীতি ও অপরাধকে সহিংসতার সুযোগ করে দেয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় সহনশীলতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ জোরদার না করলে সমস্যার মূল শেকড় অক্ষতই থেকে যাবে।
মনে রাখা দরকার, সংখ্যালঘুরা এই দেশের বাইরের কেউ নয়। মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তাদের অবদান রয়েছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, ব্যবসা—সব ক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশের অগ্রগতির অংশীদার। অথচ আজও তারা নিজেদের দেশে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে—এটি জাতি হিসেবে আমাদের ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। এই পরীক্ষায় শুধু সরকার নয়—রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সবাইকে উত্তীর্ণ হতে হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
যেদিন আমরা নির্বাচনকে সহিংসতার নয়, উৎসবের মতো উদযাপন করতে পারব—যেখানে ধর্ম, পরিচয় নয় বরং নাগরিকত্বই হবে একমাত্র পরিচয়—সেদিনই প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে এগোনো সম্ভব হবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো আশ্বাস নয়, বাস্তব পদক্ষেপ। কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি মাপা হয় সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ—সেই মানদণ্ডে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সব ভেদাভেদ ভুলে পরস্পরের পাশে দাঁড়াবেন এটাই হোক অঙ্গীকার।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট।
খবরটি শেয়ার করুন