ছবি: সংগৃহীত
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা শুধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস নয়, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম নির্মম অধ্যায়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাযজ্ঞের দায় স্বীকার করে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা আজও আসেনি। বরং বিভিন্ন সময়ে দেশটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক ভাষা ও রাজনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই দেখিয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এরপর পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি আজও এক অমীমাংসিত ক্ষত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গণহত্যার স্বীকৃতির দাবি জোরালো হচ্ছে।
তবে এতে পাকিস্তান ও মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের এদেশীয় দোসরদের অবস্থানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূতেরা ঢাকা সফরে আসেন। তাদের বিভিন্ন মন্তব্য ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নেওয়া অবস্থান এই আলোচনাকে বার বার সামনে এনেছে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা দাবি করে আসছে। কিন্তু পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক ক্ষমা শব্দটি ব্যবহার না করে ‘দুঃখ প্রকাশ’, ‘অনুশোচনা’ কিংবা ‘অতীত ভুলে সামনে এগোনোর’ মতো অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করে এসেছে। এর ফলে বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক টানাপড়েনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি দুই দেশের সম্পর্কের গভীরে একটি অমীমাংসিত ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।
১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর ঢাকা সফর ছিল এই প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দিল্লিতে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও গণহত্যার দায় স্বীকার করেনি। ভুট্টো ‘যদি কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে’—এমন শর্তসাপেক্ষ ভাষায় অনুশোচনা প্রকাশ করেন।
ঢাকায় এসে তিনি একাত্তরের ঘটনাকে ‘বেদনাদায়ক’ ও ‘লজ্জাকর’ বললেও সরাসরি ক্ষমা চাননি। বরং ‘ইসলামী ভ্রাতৃত্বের’ দোহাই দিয়ে অতীত ভুলে যাওয়ার আহ্বান জানান। তার এই অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, পাকিস্তান তখন থেকেই দায় স্বীকারের বদলে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছিল।
এদিকে যুদ্ধাপরাধ তদন্তে পাকিস্তানে গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অপরাধের প্রমাণ উঠে এলেও তা গোপন রাখা হয়। বরং অভিযোগ আছে, ভুট্টো সেই প্রতিবেদন ধ্বংসের নির্দেশ দেন। এটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে দায় আড়াল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
২০০২ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের ঢাকা সফরেও একই প্রবণতা দেখা যায়। তিনি একাত্তরের ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ও ‘বাড়াবাড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করেন, কিন্তু গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। তার বক্তব্যে ‘দুঃখ’ থাকলেও দায় স্বীকার বা ক্ষমা প্রার্থনার স্পষ্টতা অনুপস্থিত ছিল। ফলে এই সফরও বিতর্কের জন্ম দেয় এবং বাংলাদেশে তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করার দাবিও ওঠে।
পরবর্তী সময়গুলোতেও পাকিস্তানের কূটনৈতিক আচরণ একই ধারায় অব্যাহত থাকে। ২০১২ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খার ঢাকায় এসে ক্ষমা প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে আগের মতোই ‘দুঃখ প্রকাশ’ এবং ‘অতীতকে কবর দেওয়ার’ কথা বলেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানি কূটনীতিকদের বিতর্কিত মন্তব্য, যেমন শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে পাকিস্তানের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নিন্দা প্রস্তাব পাস করা হয়। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হয় এবং পাকিস্তান যে এখনো একাত্তরের সহযোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল—তারই ইঙ্গিত দেয়।
ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতেরা বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছেন। ২০১০ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে পাকিস্তান প্রকাশ্যে তাদের এদেশীয় দোসরদের পক্ষে অবস্থান নেয়।
তবে ব্যতিক্রমীভাবে ২০২২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একাত্তরের ঘটনায় পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যায় ও পাশবিকতার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু এই স্বীকারোক্তি আসে তার ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় এবং তা কোনো রাষ্ট্রীয় অবস্থান হিসেবে প্রতিফলিত হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়েও একই অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় এসে দাবি করেন, ১৯৭৪ সালের চুক্তি ও ২০০২ সালের সফরের মধ্য দিয়েই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়েছে। অথচ বাস্তবে পাকিস্তান এখনো তাদের পার্লামেন্টে কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রস্তাব গ্রহণ করেনি, জাতিসংঘেও বিষয়টি স্বীকার করেনি, এমনকি সম্পদ বণ্টন বা আটকে পড়া পাকিস্তানিদের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগও নেয়নি।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তানের সরকারি পাঠ্যপুস্তক ও সামরিক বয়ানে এখনো ১৯৭১ সালের ঘটনাকে ‘ভারতীয় ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ২০১৬ সালে লাহোরে উন্মোচিত আর্মি মিউজিয়ামের ফলকে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সহসা পাকিস্তান তাদের এই অবস্থান পরিবর্তন করবে—এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এটি শুধু অতীত অস্বীকার নয়, বরং একটি প্রজন্মকে বিকৃত ইতিহাস শেখানোর শামিল।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে একটি কৌশল অনুসরণ করেছে—যেখানে ‘দুঃখ প্রকাশ’ রয়েছে, কিন্তু দায় স্বীকার নেই; ‘সম্পর্ক উন্নয়ন’-এর কথা রয়েছে, কিন্তু ন্যায়বিচারের স্বীকৃতি নেই। ফলে একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার প্রশ্নটি আজও ইতিহাস, কূটনীতি ও নৈতিকতার সংযোগস্থলে অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
খবরটি শেয়ার করুন