ছবি: সংগৃহীত
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ১২ দিন ইতোমধ্যে পার হয়েছে। এই যুদ্ধে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকার তেলের সরবরাহ রেশনিং করা শুরু করেছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর। দেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে, যার বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের তেলের চাহিদার ৯৫ শতাংশ ও গ্যাসের চাহিদার ৩০ শতাংশই আমদানি করে মেটানো হয়। এর মধ্যে সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি হয় সবচেয়ে বেশি। ইরানের হরমুজ প্রণালি পার হয়ে এসব জ্বালানি ভারত মহাসাগর দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছায়। আর হরমুজ দিয়ে পরিবহন হয় বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ক্রমশ কমে আসছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে সরকারকে ক্রমেই বেশি পরিমাণে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। এর বড় একটি অংশ আসে কাতার, সৌদি আরব, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্কতাও জারি করে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঢাকা শহরের ফিলিং স্টেশনগুলোতে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন এই সারি দীর্ঘ হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের পর বর্তমানে তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা চলছে। বিশ্বের মোট সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত অবরুদ্ধ। গতকাল বুধবার আবার অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে হরমুজ প্রণালিতে আরও তিনটি মালবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর মধ্যে থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি বাল্ক ফ্রেটার, জাপানি পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ এবং মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের একটি জাহাজ রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ নিয়ে মোট ১৪টি জাহাজ হামলার শিকার হলো।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি খাতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকা নতুন করে বলার নেই। এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ১০টি তেল উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে ৫টিই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের। এগুলো হলো—সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান ও কুয়েত।
অবশ্য এলপিজির জন্য আগে বাংলাদেশ পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে, সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। গত দুই মাসে মোট আমদানি করা এলপিজির ৬২ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি দেশের জ্বালানি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচকে প্রভাবিত করে। ফলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের অর্থনীতিতেও চাপ পড়ে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। এই পথ দিয়েই বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও এলএনজি পরিবহন করা হয়। কোনো কারণে এই রুটে বাধা সৃষ্টি হলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয় এবং তখন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্ভরতা কমাতে হলে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ানো, সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তাদের মতে, জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন