ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদে গৃহীত বিভিন্ন শোক প্রস্তাবের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল। তার মতে, কারো মৃত্যুর পর সংসদে শোক প্রস্তাব নেওয়া হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা উপেক্ষিত হচ্ছে, যা রাজনৈতিক পক্ষপাত বা নির্বাচনী মানদণ্ডের ইঙ্গিত দেয়।
নিজের ইউটিউবভিত্তিক বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠান 'কথা'য় বৃহস্পতিবার (১২ই মার্চ) রাতে প্রকাশিত এক ভিডিওতে মাসুদ কামাল এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়টি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একজন ব্যক্তির অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই প্রক্রিয়ায় সবসময় একই ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় না।
তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সময় এমন ব্যক্তিদের জন্য সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যাদের অবদান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর পরও সংসদে কোনো শোক প্রস্তাব নেওয়া হয়নি। তার ভাষায়, 'কারা থাকবেন আর কারা থাকবেন না—এটা যেন স্পষ্ট কোনো নীতিমালার ভিত্তিতে হচ্ছে না।'
মাসুদ কামালের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংসদের উচিত এ বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মানদণ্ড নির্ধারণ করা। অন্যথায় শোক প্রস্তাবের মতো একটি সম্মানজনক প্রক্রিয়াও বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সংসদীয় রীতিনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা জরুরি। তা না হলে মানুষের কাছে সংসদের সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে।
মাসুদ কামাল মনে করেন, সংসদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভা হওয়ায় এখানকার প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটি প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। তাই শোক প্রস্তাবের মতো বিষয়েও একটি স্পষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা থাকা জরুরি। নীতিমালা না থাকলে এটি রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনার প্রভাবেই পরিচালিত হচ্ছে—এমন ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সংসদীয় সংস্কৃতি শক্তিশালী করতে হলে এমন বিষয়গুলোতে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির এই প্রক্রিয়াটি নিজেই বিতর্কের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে শোক প্রস্তাবের বিষয়টি অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বা দলীয় বিবেচনায় নির্ধারিত হচ্ছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। মাসুদ কামালের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই বিতর্ককেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
এদিকে জাতীয় সংসদে গৃহীত শোক প্রস্তাবের তালিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের অভিমত, ভবিষ্যতে এই ধরনের বিতর্ক এড়াতে সংসদীয় কার্যপ্রণালিতে শোক প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তোলা শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করা হল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন এবং বিএনপির এক নেতার নাম। বৃহস্পতিবার (১২ই মার্চ) অধিবেশনের প্রথম দিন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংক্ষিপ্ত বিরতি শেষে রেওয়াজ অনুযায়ী শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
এ সময় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, শুরা সদস্য মীর কাসেম আলী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করার প্রস্তাব ওঠে।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান। তিনি বিএনপির সাবেক এমপি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামও যুক্ত করে নেন। সংসদে আলোচনা শেষে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন নিজামী ও মুজাহিদ। আর সাঈদী ছিলেন সংসদ সদস্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ওই সাতজনই একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন।
তাদের মধ্যে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত সাঈদী কারাগারে মারা যান। আর ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাকি ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর হয়।
খবরটি শেয়ার করুন