ফাইল ছবি
প্রখ্যাত সাংবাদিক ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলছেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে এখন যে সুযোগ রয়েছে, তা আগের কোনো দলীয় নেতার ছিল না। তিনি এমন এক পরিবেশে বসে নিজ দেশ নিয়ে ভাবার সুযোগ পেয়েছেন, যেখানে গণতন্ত্র, সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এখন জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থানে আছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হতে পারে সংসদ পরিচালনা করা। সংসদে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধী দল বেশ শক্তিশালী হবে। প্রশ্ন হলো, সম্ভাব্য এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য কি ক্ষমতাসীন দলে আছে?
তার মতে, বাস্তবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও তার পরবর্তী ১৮ মাসের খুব বেশি কার্যকর না থাকা এক শাসনব্যবস্থা। নির্বাচনী প্রচারণায় এবং ব্যাপক বিজয়ের পরও তারেক রহমান নিজের এমন এক ভাবমূর্তি উপস্থাপন করেছেন, যিনি সংযত, চিন্তাশীল ও পরিচ্ছন্ন ভাবনার অধিকারী। শুরুটা ভালো করার কৃতিত্ব তাকে দেওয়া যায়। তবে এসব বিষয়ই এমন কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যেগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে গভীর আত্মসমালোচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া যে কারো জন্যই চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। আমাদের মতো দেশের ক্ষেত্রে সেটা আরও কঠিন। আমরা প্রাণ দিয়ে দেশকে ভালোবাসলেও এটা কখনোই ভুলে যাই না যে, প্রিয় এই দেশটি পরিচালনা করা কতটা জটিল।
তিনি বলেন, নতুন নির্বাচন, নতুন সংসদ, দেশের নেতৃত্বে নতুন ব্যক্তি, জবাবদিহিমূলক শাসনের নতুন সম্ভাবনা। সবমিলিয়ে নতুন এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে জনগণের ইচ্ছারই প্রতিফলন। তারেক রহমানের নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভাবও সেই পরিবর্তনেরই অংশ। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত আগে যা কল্পনাও করা যায়নি, গণঅভ্যুত্থানের পর সেটাই অনিবার্য বলে মনে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সময়ই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সম্ভাবনাকে প্রায় নিশ্চিত হিসেবেই ধরা হচ্ছিল।
'দ্য চ্যালেঞ্জেস বিফোর দ্য প্রাইম মিনিস্টার' শিরোনামে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ শুক্রবার (১৩ই মার্চ) ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে।
মাহফুজ আনাম উপসম্পাদকীয়তে নতুন সরকারের সামনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তার লেখায় প্রধানমন্ত্রীর সামনে অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজন এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকটকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নিঃসন্দেহে এগুলো দেশের বাস্তব সমস্যা।
তবে অনেকের মতে, উপসম্পাদকীয়তে সমস্যাগুলোর উৎস ও দায়বণ্টনের প্রশ্নটি যথেষ্ট গভীরভাবে আলোচিত হয়নি। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বিরোধী রাজনীতির দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহাসিক সংকট—এসব বিষয়কে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কলামটিতে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের দিক নির্দেশ করলেও বিশ্লেষণটি নিয়ে প্রশ্ন তোলারও যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। কারণ, সেখানে বাস্তব পরিস্থিতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা উপেক্ষিত হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ অনেকের কাছে একপেশে বলে মনে হতে পারে।
আরও একটি বিষয় হলো, উপসম্পাদকীয়টিতে প্রধানমন্ত্রীর সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোকে প্রায় একমুখী রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বাস্তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট শুধু সরকারের নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল নয়; বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কৌশলগত সীমাবদ্ধতা, রাজনীতির অবিশ্বাসের সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার লড়াইও এর বড় কারণ। এই দিকগুলো আলোচনায় তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত।
মাহফুজ আনামের উপসম্পাদকীয়তে অর্থনৈতিক চাপের কথা বলা হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কিংবা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রভাবের মতো বিষয়গুলো তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে। অথচ এসব বিষয় বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
মাহফুজ আনাম লেখেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন যে সুযোগ রয়েছে, তা আগের কোনো দলীয় নেতার ছিল না। তিনি নবীন এবং দীর্ঘসময় বাধ্যতামূলক নির্বাসনে ছিলেন। তিনি এমন এক পরিবেশে বসে নিজ দেশ নিয়ে ভাবার সুযোগ পেয়েছেন, যেখানে গণতন্ত্র, সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি বিরল। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাতিকে নিয়ে নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ তার রয়েছে।
উপসম্পাদকীয়তে তিনি বলেন, এটা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রধানমন্ত্রীকে অনেক কিছু করতে হবে। কিন্তু প্রথম কাজটি হতে হবে নিজের দল, সমর্থক, সহায়তাকারী, এমনকি সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। এটি অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু সেটা না করলে আমরা আবারও সেই একই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির পথে যাব, যা শেখ হাসিনা ও তার দলের পতনের কারণ হয়েছিল।
তিনি বলেন, তারেক রহমানকে তার দলকে (বিএনপি) শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং সেটা এখন থেকেই। প্রবাদে যেমন আছে, ‘লোহা গরম থাকতে থাকতেই ঘা দিতে হয়’। তিনি এখন জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থানে আছেন। তাকে কঠিন সব সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে।
তিনি বলেন, এখানেও ইতিহাসই তার পাথেয় হওয়া উচিত, যে ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে কোনো সরকার যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকে তখনই সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলো নিতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনিবার্যভাবেই জনপ্রিয়তা কমে। তখন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়াও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই বলা হয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে ‘শুরুতেই লাগাম টেনে ধরতে’ হয়।
তবে সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ও কঠিন সমস্যাটি আসবে প্রধানমন্ত্রীর নিজের দল থেকেই। বিএনপির দুটি গোষ্ঠী সরকারকে বিব্রত করতে পারে।
তার মতে, প্রথমটি তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তাদের যদি শুরু থেকেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে তারা সরকারি প্রক্রিয়া নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবে, সেগুলোকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করবে, বিকৃত করবে এবং গ্রাম বা উপজেলা পর্যায়ের প্রকল্প ও নিয়মিত সরকারি কর্মসূচিগুলোকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে পরিণত করবে।
তিনি বলেন, অপর গোষ্ঠীটি জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম সারির নেতাকর্মীরা। তারা আওয়ামী লীগের দমনমূলক শাসনামলে শারীরিক, আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ‘ক্ষতিপূরণে’র নামে এই গোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা চাইবেন, নিপীড়নের ঘটনা তুলে ধরে দলীয় নেতার কাছে সুবিধা ‘দাবি’ করবেন। এটা দলীয় প্রধানকে কঠিন নৈতিক দ্বিধায় ফেলবে। তারা সম্মিলিতভাবে বা ব্যক্তিগতভাবে বলবেন, ‘প্রায় দুই দশক ধরে আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি, আমাদের স্বাধীনতা ছিল না, আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, মানসিক শান্তি নষ্ট হয়েছে। এখন আমাদের কিছু বিশেষ সুবিধা প্রয়োজন এবং আমাদের সেটা প্রাপ্য।’
ডেইলি স্টারের প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, তারা হয়তো সরাসরি বলবে না, কিন্তু ইঙ্গিত করবে যে ‘আমরা যা সহ্য করেছি, তার কারণেই আপনি আজ এই অবস্থানে।’ দুঃখজনকভাবে, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এভাবেই অবক্ষয়ের শুরু হয়। প্রথমে ছোটখাটো সুবিধা, তারপর ছোট ব্যবসায়িক চুক্তি এবং ধীরে ধীরে সেগুলো বড় আকার ধারণ করে সুশাসনের সম্ভাবনা বিপন্ন করে তোলে।
তিনি বলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি কিছু পেশাজীবীও এসব দাবি নিয়ে আসবেন, যারা সরাসরি দলীয় পদে না থাকলেও নীরবে ও গোপনে দলকে সহায়তা করেছেন। তারা চাকরি, পদ, সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক সুবিধা নিতে চাইবেন এবং কিছু ক্ষেত্রে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির দাবিও তুলবেন। এর ফলে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে এবং আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণের প্রথম লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, উপরের সব ‘দাবি’ প্রধানমন্ত্রীর সামনে বড় নৈতিক দ্বিধা সৃষ্টি করবে। তিনি এগুলো মেনে না নিলে নিজেকে অপরাধী মনে করবেন এবং সাড়া দিলে তার সুনাম ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি কেবল ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ ও টেলিকম—এই তিনটি খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা স্বজনপ্রীতির দিকে নজর দেন, তাহলেই পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবেন যে কীভাবে নিজ দলের সদস্যরাই সরকারকে টেনে নামায়। আমি জানি বিএনপিতে থাকা আমার দীর্ঘদিনের অনেক বন্ধু এসব কথায় ক্ষুব্ধ হবেন এবং সবই অগ্রাহ্য করবেন। তবে, এটা ভুলে গেলে চলবে না—আওয়ামী লীগের নেতারাও এই ধরনের পরামর্শ অগ্রাহ্য করেছিলেন।
তিনি লেখেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে কঠিন লড়াই এবং মূলত নিজের সমর্থকদের বিরুদ্ধেই সেই লড়াই করতে হবে। সেই সঙ্গে থাকবে দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বার্থপর ব্যবসায়ীরা, যারা দলীয় কাঠামো ব্যবহার করে স্বার্থসিদ্ধি করবে এবং দেশের ক্ষতি করবে। এই প্রক্রিয়ায় তারা প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করবে এবং সরকারকে অজনপ্রিয় করে তুলবে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচন, নতুন সংসদ ও সরকার—সবই জনগণের ইচ্ছার ফল। এটা শুধু নতুন নেতার জন্য নয়, আমাদের সবার জন্যই প্রযোজ্য। আমরা এখন এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, যা হবে দুর্নীতিমুক্ত, স্বজনপ্রীতিমুক্ত, দলীয় পক্ষপাতমুক্ত এবং ভয় ও নিপীড়নমুক্ত।
খবরটি শেয়ার করুন