ছবি: সংগৃহীত
সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে জাতীয় সংসদে যে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত মিলছে। বিরোধী দলের ওয়াকআউট এবং পরবর্তী সময়ে রাজপথে আন্দোলনের ঘোষণা—দুই মিলিয়ে পরিস্থিতি নতুন এক রাজনৈতিক মোড় নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল বুধবার বিকেলে সংসদ অধিবেশনে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থার ঘাটতি গভীর। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, মূল প্রস্তাব এড়িয়ে সরকার ‘উল্টো প্রস্তাব’ সামনে এনেছে। যদিও সরকারপক্ষ, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন।
বিরোধী দলের মূল দাবি ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করা, যা তারা ‘জন-আকাঙ্ক্ষার বিষয়’ এবং গণভোট-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরেছে। শফিকুর রহমানের বক্তব্যে এই বিষয়টি পরিষ্কার—তাদের মতে, এটি কোনো দলীয় ইস্যু নয়; বরং নির্বাচনের আগে সব পক্ষের সম্মত একটি জাতীয় অঙ্গীকার।
অন্যদিকে সরকার সংসদের ভেতরেই একটি বিকল্প পথ প্রস্তাব করেছে—সংবিধান সংশোধনের জন্য সর্বদলীয় বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন। এই প্রস্তাব কার্যত নির্বাহী ও আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকেই সমাধান খোঁজার ইঙ্গিত দেয়। তবে বিরোধীরা এটিকে তাদের মূল দাবিকে পাশ কাটানোর কৌশল হিসেবে দেখছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে সংসদীয় রীতিনীতির দিকটি সামনে এসেছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, মুলতবি প্রস্তাবের মাধ্যমে এমন বিষয় উত্থাপন করা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে, যা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য। তবুও ‘উদারভাবে আলোচনা’র সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে মূল দ্বন্দ্ব। বিরোধী দল সংসদীয় প্রক্রিয়ার এই সীমাবদ্ধতাকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। তাদের মতে, বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে হলেও সিদ্ধান্ত আসা উচিত ছিল।
এদিকে ওয়াকআউট সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়; এটি প্রতিবাদের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। তবে এই ওয়াকআউটের তাৎপর্য বেশি, কারণ এটি সরাসরি গণভোট ও সংবিধান সংস্কারের মতো মৌলিক ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত।
স্পিকার যখন আরও আলোচনা ও পরবর্তী প্রস্তাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান, তখন বিরোধীদলীয় নেতা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তার বক্তব্য—মূল নোটিশকে চাপা দিতেই নতুন প্রস্তাব আনা হচ্ছে। এই অবিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত ওয়াকআউটের সিদ্ধান্তকে দৃঢ় করে।
সংসদ থেকে বেরিয়ে শফিকুর রহমান যে বার্তা দিয়েছেন, তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এখন তাদের ‘পথ একটাই’—জনগণের কাছে ফিরে যাওয়া এবং আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা।
১১টি দলের ঐক্য এবং তাদের পূর্বঘোষিত দাবির প্রসঙ্গ টেনে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই আন্দোলন শুধু একটি ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক এজেন্ডায় রূপ নিতে পারে—যেখানে সুশাসন, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানও যুক্ত থাকবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা সামনে আসে—প্রথমত, সংসদের ভেতরে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার নতুন চেষ্টা হতে পারে, যদিও বর্তমান অবস্থান থেকে তা কঠিন মনে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলের আন্দোলন বাস্তবে কতটা শক্তিশালী হয়, সেটি নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক চাপের মাত্রা। তৃতীয়ত, সরকার সংসদীয় প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে নিজেদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারে, যা রাজনৈতিক সংঘাত আরও বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি এখন শুধু একটি আইনগত বা প্রক্রিয়াগত ইস্যু নয়—এটি রাজনৈতিক বৈধতা, জনমতের প্রতিফলন এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন