রবিবার, ৫ই এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ইরানকে আর কতবার আলটিমেটাম দেবেন ট্রাম্প *** মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বদলাতে চায় জামায়াত? *** কেরানীগঞ্জে নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ টাকা করে দেবে সরকার *** সংবিধানকে ‘কাগজ’ হিসেবে দেখা মানে রাষ্ট্রের আইনি ভিত্তিকে অস্বীকার করা *** গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি জামায়াত জোটের *** জামায়াত বিএনপিকেও একদিন নিষিদ্ধ করবে: তসলিমা নাসরিন *** আওয়ামী লীগকে কী নিষিদ্ধই করতে যাচ্ছে সরকার? *** ‘বিদেশি অনুদানের দুইশো কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ড. ইউনূস’ *** ড. ইউনূসকে মুখ খুলতে হবে, অর্জন ধরে রাখতে মাঠে নামতে হবে: নাহিদ *** এপ্রিলে আসছে একাধিক তাপপ্রবাহ, যা বলছেন আবহাওয়াবিদরা

সুখবর এক্সপ্লেইনার

সংবিধানকে ‘কাগজ’ হিসেবে দেখা মানে রাষ্ট্রের আইনি ভিত্তিকে অস্বীকার করা

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ১১:৫৫ অপরাহ্ন, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার অডিটোরিয়ামে আজ শনিবার আয়োজিত এক আলোচনা সভায় লেখক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তিনি সংবিধানকে ‘শেখ হাসিনার লেখা একটা কাগজ’ বলে উল্লেখ করে শুধু রাজনৈতিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করেননি, বরং রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন—যা বিশ্লেষকদের মতে বিপজ্জনক প্রবণতা।

ফরহাদ মজহার বলেন, “সংবিধান তো একটা কাগজ। এ কাগজ হাসিনার লেখা। এ কাগজ তো শেখ হাসিনাও দেখিয়েছেন আমাদেরকে। এই কাগজ দেখায়ে আমাদের কি বুঝাবেন?”—এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি সংবিধানের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

বিএনপি নেতারা কথায় কথায় সংবিধানকে টানেন মন্তব্য করে লেখক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার বলেছেন, সংবিধান তো ‘শেখ হাসিনার লেখা একটা কাগজ’। বিএনপি সরকার গঠনের দুই মাসের মাথায় গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ‘সরকারবিরোধী’ অবস্থানে চলে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।

সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, বিএনপির সালাউদ্দিন সাহেব থেকে শুরু করে অনেক নেতা-নেত্রী দেশের জনগণকে ভোটার বলেন এবং সংবিধান সংবিধান করেন।

অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের সংবিধান কোনো একক ব্যক্তি রচিত দলিল নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয়, ঐতিহাসিক ও আইনি প্রক্রিয়ার ফল, যা সময়ের সঙ্গে সংশোধিত ও বিকশিত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধানকে ‘কাগজ’ হিসেবে ছোট করে দেখা মানে রাষ্ট্রের আইনি ভিত্তিকে অস্বীকার করা। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধানই নাগরিক অধিকার, ক্ষমতার ভারসাম্য ও শাসনব্যবস্থার মূল কাঠামো নির্ধারণ করে। সেটিকে ব্যক্তিনির্ভর বলে উপস্থাপন করা হলে তা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা দুর্বল করতে পারে।

এদিকে ফরহাদ মজহার দাবি করেন, বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই গ্রামীণ জনগণের বড় অংশ সরকারবিরোধী হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “আমি গ্রামের ২০-২৫ জন মানুষের সাথে কথা বলে দেখলাম, অধিকাংশই সরকারের বিরোধী।” তবে এই ধরনের সীমিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি সামগ্রিক জাতীয় চিত্র তুলে ধরা কতটা গ্রহণযোগ্য—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ২০-২৫ জন মানুষের মতামত কোনোভাবেই একটি দেশের গ্রামীণ জনমতের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। ফরহাদ মজহার আরও বলেন, “এই যে গ্রামের মানুষদের মধ্যে একধরনের সচেতনতা এসেছে এবং তারা যে শুধু ভোটার না, সে যে একটা নতুনভাবে বাংলাদেশ গঠন করার কর্তাও, এই বোধটুকু আসছে।”

জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক; তবে সেটিকে সংবিধানবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার ৪৮টি বিষয়ের ওপর গণভোট আয়োজন করেছে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে। এই প্রক্রিয়া নিজেই প্রমাণ করে যে সংবিধান একটি পরিবর্তনশীল দলিল, যা জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কারযোগ্য। কিন্তু এটিকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথ নয়।

ফরহাদ মজহার তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও টেনে আনেন। তিনি বলেন, “এটা জায়নবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।” একই সঙ্গে তিনি শিল্পভিত্তিক সভ্যতাকে জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করেন। এই বক্তব্যগুলো তার দীর্ঘদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, দেশের সংবিধান ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোচনায় এই ধরনের বৈশ্বিক তত্ত্ব টেনে আনা কতটা প্রাসঙ্গিক—সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংবিধান নিয়ে বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক এবং একটি সুস্থ গণতন্ত্রে এটি প্রয়োজনীয়ও। তবে সেই বিতর্ক হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর এবং দায়িত্বশীল। সংবিধানকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা অবজ্ঞাসূচকভাবে উপস্থাপন করলে তা রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

দেশের সংবিধান স্বাধীনতার পর একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল। এটি কেবল একটি আইনি দলিল নয়; বরং রাষ্ট্রের পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং নাগরিক অধিকারের প্রতীক। ফলে এটিকে ‘একজনের লেখা কাগজ’ হিসেবে চিহ্নিত করা ইতিহাস ও বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ঢাকার এই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন ফরিদা আখতার, সারোয়ার তুষারসহ বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব। সভাটি আয়োজন করে ‘ভাববৈঠকী’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। তবে আলোচনার মূল ফোকাস হয়ে ওঠে ফরহাদ মজহারের সংবিধানবিষয়ক মন্তব্য, যা ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

সব মিলিয়ে, ফরহাদ মজহারের বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—সংবিধান কি শুধুই একটি ‘কাগজ’, নাকি একটি জাতির চুক্তি? বাস্তবতা বলছে, এটি কেবল কাগজ নয়; বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে অস্বীকার না করে বরং কীভাবে আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মূল বিষয়।

ফরহাদ মজহার

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250