ছবি: সংগৃহীত
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের আলোচনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত লেখক তসলিমা নাসরিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, একটি দলকে নিষিদ্ধ করার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।
আজ শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তসলিমা নাসরিন লিখেছেন, "দৈনিক ইত্তেফাকের খবরের শিরোনাম—আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ সংশোধনীসহ পাস হচ্ছে সংসদে। আমার মনে হয় না, এত বড় ভুল করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, একটা রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করবেন। যদি করেন, তাহলে তিনি নিশ্চিতই গণতন্ত্র মানেন না। জামায়াতে ইসলামীর জিহাদি সন্ত্রাসীরা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে হাবিজাবি অনেক কিছুই করতে চাইবে, এসব প্রশ্রয় দেওয়া মানে নিজের পায়ে কুড়োল মারা।"
জগদ্বিখ্যাত লেখক তসলিমা নাসরিনের এই বক্তব্যে দেশের রাজনীতিতে সম্ভাব্য অস্থিরতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে শঙ্কা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের বিষয় নয়; বরং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর পড়তে পারে।
পোস্টের আরেক অংশে তিনি আরও লিখেছেন, "জামায়াতে ইসলামীর সন্ত্রাসীরা বিএনপিকেও একদিন নিষিদ্ধ করবে। দেশে প্রগতির পক্ষের কোনো রাজনীতির অস্তিত্ব রাখবে না।" এই মন্তব্যে তিনি মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন দল ও মতাদর্শের সহাবস্থানকে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে তসলিমা নাসরিন বলেন, "নিষিদ্ধের রাজনীতি বাদ দিন, বড় দলকে নিষিদ্ধ করে টিকে থাকার ষড়যন্ত্র বাদ দিন। দেশের উন্নয়ন করুন, মানুষের আর্থিক, সামাজিক, শিক্ষাগত ও স্বাস্থ্যগতসহ আদর্শিক এবং নৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করুন। সততা, আর সমতার পক্ষে থাকুন। দেশের মানুষ আপনাদের ভোট দেবে, কারচুপির দরকার হবে না।"
তার এই আহ্বানে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি একটি নীতিনিষ্ঠ ও গণতান্ত্রিক আচরণের প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, জনগণের আস্থা অর্জনের একমাত্র পথ হলো উন্নয়ন, স্বচ্ছতা এবং সমতা নিশ্চিত করা—কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা নয়।
তসলিমা নাসরিনের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ তার বক্তব্যকে রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে কঠোর সমালোচনা হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে এটিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
উল্লেখ্য, তসলিমা নাসরিন দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মৌলবাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নারী অধিকার নিয়ে লেখালেখি করে আসছেন। তার লেখনী ও মতামত প্রায়ই বিতর্কের জন্ম দিলেও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি একজন সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের প্রশ্নটি বাংলাদেশে নতুন নয়; অতীতেও বিভিন্ন সময় এ ধরনের আলোচনা ও পদক্ষেপ দেখা গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে তসলিমা নাসরিনের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক সহনশীলতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। তার ভাষায়, নিষিদ্ধের রাজনীতি পরিহার করে উন্নয়ন ও ন্যায়ভিত্তিক শাসন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য।
খবরটি শেয়ার করুন