শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আওয়ামী লীগকে কী নিষিদ্ধই করতে যাচ্ছে সরকার? *** ‘বিদেশি অনুদানের দুইশো কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ড. ইউনূস’ *** ড. ইউনূসকে মুখ খুলতে হবে, অর্জন ধরে রাখতে মাঠে নামতে হবে: নাহিদ *** এপ্রিলে আসছে একাধিক তাপপ্রবাহ, যা বলছেন আবহাওয়াবিদরা *** আলোচনা-সমালোচনায় মাহবুব মোর্শেদের অনিয়ম ও দুর্নীতি *** দেশে কাশি আর জাপানে হাসি, মেটিকুলাস নকশার রূপ: মুজতবা দানিশ *** বৈশ্বিক সংকটের ছায়ায় রাজপথের রাজনীতি, সংকট বাড়ার শঙ্কা *** উৎপাদন থাকলেও কেন পেট্রোল-অকটেন সংকট? *** সাংবাদিক তানবিরুল মিরাজকে হয়রানি বন্ধের আহ্বান সিপিজের *** শক্তিশালী সরকারকে হটানো গেছে, এই সরকারকেও হটানো সম্ভব: শহিদুল আলম

‘বিদেশি অনুদানের দুইশো কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ড. ইউনূস’

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৭:৫৪ অপরাহ্ন, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: টাইমস অব ইসরায়েল

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে আবারও নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে বিদেশি অনুদানের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে।

সম্প্রতি একটি অনলাইন টকশো ও সংশ্লিষ্ট ভিডিওর বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে, নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থা নোরাডের দেওয়া বিপুল পরিমাণ অনুদানের একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা থাকলেও, নতুন করে তা সামনে আসায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত একটি ভিডিওতে আলোচিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও ব্লিৎস পত্রিকার সম্পাদক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী বলেন, নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থা নোরাডের দেওয়া প্রায় দুইশো কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন ড. ইউনূস। এই বক্তব্য তিনি দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মঞ্জুরুল আলম পান্নার সঞ্চালনায় একটি টকশোতে, যা ইউটিউবভিত্তিক ‘মানচিত্র’ চ্যানেলে সম্প্রচারিত হয়।

ভিডিওতে সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী অভিযোগ করেন, নোরাড থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ গ্রামীণ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছিল। যা ড. ইউনূস করেন অবৈধভাবে।

তার ভাষ্যমতে, এই অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ছিল না এবং তা যথাযথভাবে ব্যবহার না হয়ে অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একসময় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল এবং নরওয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল।

টকশোর আলোচনায় উঠে আসে, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে নোরাডের অনুদান ব্যবহারের বিষয়ে একটি তদন্ত বা অনুসন্ধানের দাবি ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেন।

তবে পরবর্তীতে এই বিতর্কের নিষ্পত্তি কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্নমত রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন, বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছিল এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। তবে সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী টকশোতে বলেন, অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি মীমাংসার জন্য ড. ইউনূস তখন নরওয়ের রাজপরিবারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

ভিডিওতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি করা হয় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে। সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ফোন করে এক এগারোর আমলের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদকে ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। এই দাবি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

এদিকে, ভিডিওতে উপস্থাপক মঞ্জুরুল আলম পান্না আলোচনাকে এগিয়ে নিতে গিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলেন—বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অনুদান ব্যবস্থাপনা, এনজিও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এসব অভিযোগের অনুসন্ধান কতটা হয়েছে, সে বিষয়ে। আলোচনায় অংশগ্রহণকারী দাবি করেন, এ ধরনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি দূর হয়।

সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী টকশোতে বলেন, ২০১০ সালে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনআরকে-এ প্রচারিত “কট ইন মাইক্রো ডেট” প্রামাণ্যচিত্রে বলা হয়, ১৯৯০-এর দশকে নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থা নোরাড থেকে পাওয়া প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার একটি অংশ গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অন্য একটি সংস্থা—গ্রামীণ কল্যাণে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এই স্থানান্তরকে কেন্দ্র করেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত।

প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে দেওয়া অর্থ একটি পৃথক সামাজিক উন্নয়ন সংস্থায় সরিয়ে নেওয়া হয়, যা মূল প্রকল্পের আওতায় ছিল না। নির্মাতা টম হেইনেম্যান দাবি করেন, এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল এবং অর্থ ফেরতের বিষয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ফলে ডেনিশ সাংবাদিক টম হেইনেম্যান নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র “কট ইন মাইক্রো ডেট” প্রকাশের পর যে অভিযোগ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা সময়ের ব্যবধানে আবারও সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। অভিযোগ প্রকাশের পর নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থা নোরাড বিষয়টি তদন্ত করে। তবে তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন হয়েছিল।

নরওয়ের তৎকালীন আন্তর্জাতিক উন্নয়নমন্ত্রী এরিক সোলহেইম মন্তব্য করেন, সহায়তার অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করা নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তার এই মন্তব্য বিতর্ককে আরও তীব্র করে তোলে, যদিও তিনি অপরাধমূলক দায় সরাসরি আরোপ করেননি।

অভিযোগটি প্রকাশের সময় বাংলাদেশেও বিষয়টি আলোচিত হয়। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার কথা জানায়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যখন ড. ইউনূসকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক সামনে আসছে, তখন এই পুরনো ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরনো তথ্য, প্রতিবেদন ও মতামত নতুন করে শেয়ার করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অভিযোগ ছিল, প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি অংশ মূল উদ্দেশ্যের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

উন্নয়ন অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে সরলভাবে “দুর্নীতি” বা “নির্দোষ ভুল” হিসেবে দেখার পক্ষে নন। তাদের মতে, এখানে মূল প্রশ্ন হলো—প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও চুক্তির শর্ত মেনে চলা।

তাদের ভাষায়, “এই ঘটনাটি দেখায় যে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে অর্থ স্থানান্তর বা পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ ফেরত দেওয়া হলেও প্রক্রিয়াটি যদি চুক্তি অনুযায়ী না হয়, তাহলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।”

সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250