ছবি: সংগৃহীত
দেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে জ্যেষ্ঠ আলোকচিত্রী ও বিতর্কিত পরিবারের সদস্য শহিদুল আলমের বক্তব্য ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে রাজনৈতিক কার্যক্রম নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে 'হটানোর' বিষয়ে তার মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি নিছক মতপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকার এখনো দুই মাস পূর্ণ করেনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ—প্রশাসনিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়টিতে সরকারকে সময় দেওয়া এবং গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সহযোগিতা করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু এর বিপরীতে সরাসরি ‘সরকার হটানোর’ মতো বক্তব্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কতটা সহায়ক—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
জাতীয় প্রেসক্লাবে আজ শুক্রবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শহিদুল আলম বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে বর্তমান সরকারকেও সরিয়ে দেওয়া সম্ভব। তার বক্তব্যে সাবেক আওয়ামী লীগের সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার উদাহরণ টেনে বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও একই পরিণতির হুমকি ও ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনা স্বাভাবিক হলেও, ক্ষমতা গ্রহণের এত অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার পতনের হুমকি দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সাধারণত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে অতীতে এ ধরনের বক্তব্য এলেও কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পদে না থাকা শহিদুল আলমের কাছ থেকে এমন বক্তব্য আসা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।
শহিদুল আলম নিজেকে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি না করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ে, অর্থাৎ জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো সুখবর ডটকমকে বলছে, সংবিধান সংস্কার, গণভোট এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে যেসব কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে, সেখানে জামায়াতের পক্ষে শহিদুল আলম কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
জামায়াতে ইসলামী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর আয়োজিত সভা-সেমিনারে শহিদুলের অস্বাভাবিক উপস্থিতি এবং সমর্থনকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি ছাত্রশিবিরের আয়োজিত সেমিনারেও তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার বক্তব্য দিয়েছেন, যেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ দ্রুত গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে—তিনি কি কেবল একজন স্বাধীন চিন্তাবিদ, নাকি একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কাজ করছেন?
শহিদুল আলমের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এটি কি একজন সচেতন নাগরিকের মতপ্রকাশ, নাকি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ? তার বক্তব্যের ভাষা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন অভিযোগ একত্রে বিবেচনা করলে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।
গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্যমতে, কথিত ‘সুশীল সমাজের’ কিছু সদস্যকে সামনে রেখে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে জনমত গঠনের রাজনৈতিক কৌশল নেওয়া হয়েছে। সেখানে শহিদুল আলমকে একটি কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক ও পরিচালিত বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছেন, সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবিগুলোকে জোরালো করছেন।
এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—সুশীল সমাজের ভূমিকা কি নিরপেক্ষ থাকবে, নাকি তারা রাজনৈতিক শক্তির পরোক্ষ হাতিয়ার হয়ে উঠবে?
কোনো কোনো সূত্রের মতে, শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ হলো বিদেশি সংস্থার সঙ্গে তার রহস্যময় যোগাযোগ। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তিনি একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলে তদ্বির চালান। তার এসব কর্মকাণ্ড মূলত বিএনপির বিরুদ্ধে।
এদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সংসদের উত্তাপ রাজপথে টেনে নিতে চাচ্ছে জামায়াত। গণভোটের আলোকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আগামীকাল শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট।
একই দাবিতে বিভিন্ন সভা, সেমিনার করছে জামায়াত-শিবির। এসব সমাবেশে কখনো উপস্থিত হয়ে, কখনো নেপথ্যে সমর্থন যোগাচ্ছেন শহিদুল আলম। বিষয়গুলো তাই গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সুখবর ডটকম তার সরাসরি বক্তব্য জানতে পারেনি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। একটি নবগঠিত সরকারের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রভাব বা লবিংয়ের আশঙ্কা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলতে পারে।
শহিদুল আলমের পারিবারিক ইতিহাস নিয়েও আলোচনা উঠেছে। পাকিস্তান আমলের বিতর্কিত নেতা খান এ সবুরের সঙ্গে তার আত্মীয়তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। যদিও ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান তার পারিবারিক ইতিহাস দিয়ে প্রায় সময় নির্ধারণ হয় না, তবুও জনমনে একটি ধারণা তৈরিতে এই বিষয়গুলো প্রভাব ফেলে।
পাকিস্তান আমলের যোগাযোগমন্ত্রী খান এ সবুর ছিলেন দেশের স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী। যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় এ নেতা মারা যান ১৯৮২ সালে। খান এ সবুরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় শহিদুল আলম।
২০১৮ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর শহিদুল আলম আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, তাকে তখন নির্যাতন করা হয়েছে। তবে সে সময় সরকারপক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাকে মিথ্যা তথ্য প্রচারের কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যা সহিংসতা উসকে দিতে পারত।
আল জাজিরার ‘হেড টু হেড’ অনুষ্ঠানের মুখামুখি হয়ে ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী স্টুডিওতে দর্শকদের উপস্থিতিতে বলেছিলেন, আল জাজিরাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্যে শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগে। তার প্রচারিত তথ্যগুলো সন্ত্রাসকে উসকে দিচ্ছিল। শহিদুল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
এই ঘটনার পর থেকেই শহিদুল আলম একদিকে মানবাধিকারকর্মী হিসেবে পরিচিতি পান, অন্যদিকে বিতর্কিত চরিত্র হিসেবেও চিহ্নিত হন। ফলে তার বর্তমান বক্তব্যগুলোও অনেকের কাছে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ নয়, বরং একটি ধারাবাহিক অবস্থানের অংশ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
একাধিক বিশ্লেষক সুখবর ডটকমকে বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা। এই অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
অভিজ্ঞদের অভিমত, একই সঙ্গে তারেক রহমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—সমালোচনাকে দমন না করে, বরং গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু যদি সমালোচনার আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চাপ সৃষ্টি বা অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা থাকে, তাহলে তা মোকাবিলায় কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।
তাদের মতে, নবগঠিত সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—অযৌক্তিক চাপ ও রাজনৈতিক প্ররোচনার বাইরে থেকে নিজেদের কর্মদক্ষতার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করা। অন্যদিকে, জনপরিসরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করা—এটিও গণতান্ত্রিক পরিবেশের অপরিহার্য শর্ত।
প্রসঙ্গত, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এককভাবে ২০৯টিতে জয়ী হয় বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সদস্যরা ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট আন্দোলন-পরবর্তী একটি নির্বাচিত সরকার গঠন এবং এর যাত্রা শুরু হয়। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বে এ যাত্রা শুরু হয়।
খবরটি শেয়ার করুন