মঙ্গলবার, ৭ই এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৩শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** এক–এগারোর ‘সুবিধাভোগী’ সাংবাদিকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতে চায় সরকার *** চীন সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব *** জুলাই জাতীয় সনদ ঘিরে অনড় সরকার–বিরোধী দল, সমঝোতা নেই *** তারেক রহমান সরকারের প্রথম একনেক সভা *** মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে খেলাধুলার বিকল্প নেই: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী *** প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ *** নতুন সরকারের প্রথম একনেক বৈঠক আজ, অগ্রাধিকার পাচ্ছে ১৭ প্রকল্প *** নিষিদ্ধ করলেই রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের শক্তি বিলীন হয়ে যাবে না *** ইরানে যুদ্ধের প্রভাবে ভারতে কনডমের দাম বাড়তে পারে *** সোমবার ইরানের শেষ সুযোগ, মঙ্গলবার পাওয়ার প্ল্যান্ট গুঁড়িয়ে দেবেন ট্রাম্প

তালিকায় অর্ধশতের নাম

এক–এগারোর ‘সুবিধাভোগী’ সাংবাদিকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতে চায় সরকার

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০১:০২ পূর্বাহ্ন, ৭ই এপ্রিল ২০২৬

#

এক–এগারোর জরুরি অবস্থার বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কে দেশের রাজনীতি ও গণমাধ্যমের ইতিহাসে একটি বিশেষ মোড় হিসেবে দেখা হয়। সেই সময়ের ভূমিকা ঘিরে এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছেন একদল সাংবাদিক—যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা তখন পেশাগত দায়িত্বের সীমা শুধু অতিক্রমই করেননি, বরং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে পরবর্তীকালে বিপুল আর্থিক সুবিধা অর্জন করেছেন।

বর্তমান সরকার এই অভিযোগগুলোর তদন্ত করে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে উদ্যোগী হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত একটি তালিকায় অন্তত অর্ধশত সাংবাদিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তালিকায় বর্তমান ও সাবেক মিলিয়ে অন্তত দশজন সম্পাদক এবং পত্রিকা ও টেলিভিশনের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা প্রায় ৩৫ জন সাংবাদিকের নাম রয়েছে। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র সুখবর ডটকমকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

জানা গেছে, তালিকাভুক্ত অনেক সাংবাদিক ইতোমধ্যে চাকরিচ্যুত। কেউ কেউ বিদেশে অবস্থান করছেন, আবার কেউ আত্মগোপনে আছেন। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও রয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়ের হওয়া কিছু মামলায় তাদের নাম এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের একাধিক সংস্থা তদন্ত করছে।

সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক বলছেন, অভিযুক্ত সাংবাদিকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করার বিষয়টি কোনোভাবেই ভিন্নমত দমনের উদ্যোগ নয়; বরং সাংবাদিকতার আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেন, “সরকার চায় না যে এই উদ্যোগকে ভিন্নমত দমনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হোক। বরং নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণই মূল লক্ষ্য। সরকার সতর্ক, এই প্রক্রিয়া যেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপে পরিণত না হয়।”

সূত্র বলছে, তারেক রহমানের সরকার ভিন্নমত প্রকাশের ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। অভিযুক্ত সাংবাদিকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করার বিষয়টি কোনোভাবেই ভিন্নমত দমনের অংশ নয়। এক–এগারোর সময় অনেক সাংবাদিক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তৎকালীন সামরিক সমর্থিত সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা তখন আটক রাজনৈতিক নেতাদের জবানবন্দি তৈরিতে ভূমিকা রাখতেন এবং সেনা কর্মকর্তাদের পরামর্শে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লিখতেন।

রাজনীতিবিদদের, বিশেষ করে বিএনপির নেতাদের চরিত্র হনন করে লেখা এসব সংবাদ বিজ্ঞপ্তি কোনো বাছ-বিচার ও তথ্য যাচাই-বাছাই করা ছাড়াই দেশের পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে প্রচার, প্রকাশ হতো। এক–এগারোর পরবর্তী আওয়ামী লীগের শাসনামলেও এই ধারা কম-বেশি অব্যাহত ছিল। তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জড়িয়ে নানা মিথ্যাচার করা হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অপপ্রচারের শিকার হয়েছে এক এগারো থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে পর্যন্ত। এর আগে দলটি সরকারে ও বিরোধী দলে থাকাকালে সমালোচনা ও অপপ্রচারের শিকার হলেও তা এক এগারো এবং এর পরবর্তী আওয়ামী লীগের শাসনামল পর্যন্ত সময়ের মতো এতো পরিকল্পিত ছিল না। এর পেছনে রয়েছেন এক এগারোর আমলে সুবিধাভোগী ও পরে আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে হাজার কোটি টাকা কামিযে নেওয়া অভিযুক্ত এসব সাংবাদিক।

সেই সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে এক–এগারোর সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগও কম-বেশি অপপ্রচারের শিকার হয়, যদিও পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় এলে দলটির সঙ্গে এক–এগারোর কালে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী অনেক সাংবাদিকের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এক–এগারোর সময় সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে। কিছু সাংবাদিক ‘বিরাজনীতিকরণ’ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল মূলধারার দলগুলোকে, বিশেষ করে বিএনপিকে দুর্বল করা। এক–এগারোর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তালিকাভুক্ত অনেক সাংবাদিক ধীরে ধীরে সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—এক–এগারোর এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে নানাভাবে আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিদেশে সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন উপায়ে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন।

সূত্র জানায়, তারা এমন তথ্য পেয়েছে যে, ওই সময়ে একাধিক সাংবাদিক দেশের বাইরে সম্পদ গড়েছেন, যার উৎস স্পষ্ট নয়। আরও জানা গেছে, তালিকায় থাকা একজন সাবেক সম্পাদক এক–এগারোর সময় বিশেষ আর্থিক সুবিধা পেয়েছিলেন। একইসঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের এক–এগারো নিয়ে লেখা বলে পরিচিত বইয়ের পেছনেও ওই সাংবাদিকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। মূলত ওই সাংবাদিকই মইন ইউ আহমেদকে বইটি লিখে দেন।  গত আওয়ামী লীগের সরকারের আমলেও ওই সাংবাদিক বিশেষ সুবিধাভোগী ছিলেন।

অভিযুক্ত ও বর্তমানে কারাগারে থাকা একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্তে উঠে এসেছে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের শীর্ষ পদে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত কর্মরত থাকা এক সাংবাদিক উত্তরবঙ্গের কোনো একটি জেলায় তার গ্রামের বাড়িতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। আওয়ামী লীগের সরকারের সাবেক এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এক সাংবাদিকের বিদেশে সম্পত্তি কেনার বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের আমল থেকেই বিতর্ক ছিল।

বিএনপির নেতারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, এক–এগারো থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত তারা পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। তাদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় কিছু সাংবাদিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দলটির দাবি, এই সময়কালে তাদের নেতাকর্মীরা অসংখ্য মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন, অথচ অভিযুক্ত সাংবাদিকেরা এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেননি। বিএনপির জ্যেষ্ঠ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তখন সাংবাদিকতার আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।”

সম্প্রতি নিজের লেখা বিশেষ মন্তব্য প্রতিবেদনে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণায় এক-এগারো সরকার যে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করেছিল, সেটি ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। তিনি অবশ্য বিএনপিবিরোধী প্রচারণা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব থেকে তার ব্যর্থতার জন্য শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।”

তিনি আরো লেখেন, “বেশ দ্রুততার সঙ্গে এক-এগারোর কুশীলবদের (সরকারের) আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টার প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকারের যেকোনো পদক্ষেপের প্রতি দৈনিক আমার দেশের অব্যাহত সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি।”

সরকার বলছে, অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এগোবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যেন ভুল বার্তা না যায়, সে বিষয়েও সতর্কতা রাখা হচ্ছে। অভিজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া যদি সত্যিই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়, তবে তা শুধু অতীতের হিসাব-নিকাশই নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

গণমাধ্যম সাংবাদিক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250