রবিবার, ৫ই এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ইরানে যুদ্ধের প্রভাবে ভারতে কনডমের দাম বাড়তে পারে *** সোমবার ইরানের শেষ সুযোগ, মঙ্গলবার পাওয়ার প্ল্যান্ট গুঁড়িয়ে দেবেন ট্রাম্প *** সড়ক পরিবহনমন্ত্রী আ.লীগের মন্ত্রীদের মতো উত্তর দিয়েছেন: বিএনপির এমপি মনিরুল *** সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৩২ করে সংসদে বিল পাস *** ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় হামের বিশেষ টিকাদান *** ধর্ম পালন করায় মানসিক নিপীড়ন, মেডিকেল শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য *** ‘গয়েশ্বর রায়ের কাছে ব্যক্তিত্বের মূল্য মন্ত্রণালয়ের চেয়েও বড়’ *** এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি দুর্বল: জাতিসংঘের প্রতিবেদন *** প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন ও ছালেহ শিবলী *** ‘নরক’ নামানোর হুমকি ট্রাম্পের, পালটা যে পরিণতির বার্তা দিল ইরান

ধর্ম পালন করায় মানসিক নিপীড়ন, মেডিকেল শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০৮:২৮ অপরাহ্ন, ৫ই এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা শহরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিনের অকালমৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং দেশের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান মানসিক চাপ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং ধর্মীয় সহনশীলতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের হোস্টেল কক্ষ থেকে অসুস্থ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর থেকে সহপাঠীদের অভিযোগ, পরিবারের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

অর্পিতা নওশিন ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি খুলনা সদরে। পরিবারের দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। সহপাঠীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ছিলেন শান্ত, বিনয়ী এবং ধর্মপরায়ণ। নিয়মিত নামাজ ও ধর্মীয় অনুশীলন তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল। তবে এই ধর্মচর্চাই তার জন্য মানসিক চাপে পরিণত হয়েছিল—এমন অভিযোগ তুলেছেন তার সহপাঠীরা।

সহপাঠীদের অভিযোগ, ইসলামের অনুসারী হিসেবে অর্পিতা নওশিন নিয়মিত ধর্মকর্ম পালন করতেন। তবে ধর্মীয় কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে তার কোনোভাবেই কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। সে ছিল চুপচাপ ও বিনয়ী স্বভাবের। ডা. মনিরা অন্যের ধর্মপালন মেনে নিতে পারেন না। এসব কারণে নওশিন মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ডা. মনিরার রোষানলে ছিলেন। তাকে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপে রাখা হতো। একটি বিষয়ে পাঁচবার পরীক্ষা দিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি। এতে মানসিক চাপে ১০৯টি ট্যাবলেট সেবন করে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

ঘটনার পরদিন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় এবং থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যাদের সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নওশিনের অনেক সহপাঠী সুখবর ডটকমকে আজ রোববার মুঠোফোনে বলেন, “নওশিন নিয়মিত ইসলাম ধর্ম পালন করতো। ডা. মনিরা সেটা পছন্দ করতেন না। তিনি নওশিনকে বলতেন, তোমার কাজ ধর্মকর্ম পালন করা নয়, তোমার কাজ চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়া। এরপরেও নওশিন নিয়মিত নামাজ পড়া চালিয়ে গেলে ডা. মনিরা বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি।”

এই অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক ডা. মনিরার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে তিনি গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন এবং কোনো কলও রিসিভ করছেন না। সুখবর ডটকম তার বক্তব্য জানতে পারেনি।

সহপাঠীদের আরও দাবি, প্রথম বর্ষ থেকেই অ্যানাটমি বিভাগে নওশিন সমস্যায় পড়েন। অন্যান্য সব বিষয়ে পাস করলেও অ্যানাটমিতে ফেল করেন। এরপর টানা পাঁচবার পরীক্ষা দিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম বর্ষেই তাকে প্রকাশ্যে ফেল করানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

নওশিনের ভাই শাহরিয়ার আরমান মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, “আমার বোনের আত্মহত্যা করার মতো মানসিকতা ছিল না। কলেজের মানসিক চাপই তাকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে। প্রথম বর্ষ থেকেই তাকে মানসিকভাবে নিপীড়ন করা হয়েছে। সবাই পাস করলেও আমার বোনকে একটি বিষয়ে আটকে রাখা হয়েছে। তার সমস্যা কী, সেটাও কেউ বলেনি।”

তিনি আরও বলেন, “প্রেসার দিতে দিতে আমার বোনকে মেন্টালি নিপীড়ন যারা করেছে, তারাই এই মার্ডার করেছে।”

অন্যদিকে কলেজের অধ্যক্ষ ফজলুল হক সুখবর ডটকমকে বলেন, “ঘটনার পর আমরা তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছি। যদি কেউ দায়ী থাকে, তদন্তে প্রমাণ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” পুলিশ জানিয়েছে, পরিবার এখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেয়নি, তবে বিষয়টি তদন্তাধীন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ, হতাশা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে বহুদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।

তাদের মতে, মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং চাপপূর্ণ। এর সঙ্গে যদি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক খারাপ হয় বা কোনো শিক্ষার্থী নিজেকে টার্গেটেড মনে করে, তাহলে তার মানসিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে। একই বিষয়ে বারবার ফেল করা একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। এক্ষেত্রে কাউন্সেলিং সাপোর্ট বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ সময় একটি বিষয়ে আটকে রাখা হলে তার পেছনের কারণ স্বচ্ছভাবে জানানো জরুরি। নইলে তা বৈষম্যের ধারণা তৈরি করতে পারে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধর্মচর্চা নিয়ে অভিযোগ। সহপাঠীদের বক্তব্য সত্য হলে এটি শুধু ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নও তুলে। কারণ, দেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মচর্চার কারণে একজন শিক্ষার্থীকে বৈষম্যের শিকার হতে হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

অর্পিতা নওশিনের মৃত্যু এখন শুধু একটি তদন্তের বিষয় নয়; এটি একটি ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। তার সহপাঠীদের অভিযোগ, পরিবারের কান্না এবং কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুত তদন্ত—সব মিলিয়ে সত্য উদঘাটনের অপেক্ষা।

কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—এ ধরনের ঘটনা আর কতবার ঘটলে আমরা কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে এগোব?

মানসিক নিপীড়ন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250