সোমবার, ৬ই এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৩শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** তারেক রহমান সরকারের প্রথম একনেক সভা *** মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে খেলাধুলার বিকল্প নেই: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী *** প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ *** নতুন সরকারের প্রথম একনেক বৈঠক আজ, অগ্রাধিকার পাচ্ছে ১৭ প্রকল্প *** নিষিদ্ধ করলেই রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের শক্তি বিলীন হয়ে যাবে না *** ইরানে যুদ্ধের প্রভাবে ভারতে কনডমের দাম বাড়তে পারে *** সোমবার ইরানের শেষ সুযোগ, মঙ্গলবার পাওয়ার প্ল্যান্ট গুঁড়িয়ে দেবেন ট্রাম্প *** সড়ক পরিবহনমন্ত্রী আ.লীগের মন্ত্রীদের মতো উত্তর দিয়েছেন: বিএনপির এমপি মনিরুল *** সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৩২ করে সংসদে বিল পাস *** ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় হামের বিশেষ টিকাদান

সুখবর এক্সপ্লেইনার

জুলাই জাতীয় সনদ ঘিরে অনড় সরকার–বিরোধী দল, সমঝোতা নেই

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০২:৫৯ অপরাহ্ন, ৬ই এপ্রিল ২০২৬

#

জাতীয় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন নিয়ে টানা আলোচনা শেষ হলেও রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো সুনির্দিষ্ট পথরেখা তৈরি হয়নি। বরং সরকারি দল ও বিরোধী দল নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

সংসদের ভেতরে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা বিতর্কে উভয় পক্ষই সনদের প্রতি আনুগত্যের কথা বললেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গতকাল রোববার সংসদ অধিবেশনে ৬২ বিধির আওতায় উত্থাপিত মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় এই অচলাবস্থার চিত্র সামনে আসে। প্রস্তাবটি তুলেছিলেন বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক।

‘ভবিষ্যতের পথরেখা’ হিসেবে চিহ্নিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে—এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সংসদ মুলতবি করে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ জানান, একই ধরনের একটি প্রস্তাব এর আগেও ৩০ মার্চ আলোচিত হয়েছে। ফলে বিষয়টি যে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে, তা স্পষ্ট।

সংসদে আলোচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—উভয় পক্ষই জুলাই সনদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। কিন্তু কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, সেই প্রশ্নে মতবিরোধ গভীর।

সরকারি দল বলছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই সনদের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। অন্যদিকে বিরোধী দল জোর দিচ্ছে ‘সংস্কার’-এর ওপর, যা তাদের মতে কেবল সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যে এই অবস্থান পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেন, সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনো সমঝোতার সুযোগ রয়েছে।

তার ভাষায়, “যতটুকু সংস্কার হওয়ার, সংস্কার হবে; যেখানে সংশোধন দরকার, সংশোধন হবে।” অর্থাৎ, বিরোধী দল সংশোধনের বিরোধী নয়, তবে তারা বৃহত্তর কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষপাতী।

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, বিরোধী দল কখনো সংবিধান বাতিল বা ছুড়ে ফেলার কথা বলেনি। বরং তারা এমন পরিবর্তন চায়, যা গত পাঁচ দশকে বারবার “ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে”—এমন কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করবে।

এই বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—বিরোধী দল নিজেদের অবস্থানকে ‘সংবিধানবিরোধী’ নয়, বরং ‘সংবিধান সংস্কারপন্থী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংসদ নেতা তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সংবিধান সংস্কার হয় না; সংশোধন হয়।” তার এই বক্তব্য শুধু একটি আইনি অবস্থান নয়, বরং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন।

সরকারের যুক্তি হলো, সংবিধান পুনর্লিখন বা নতুন সংবিধান প্রণয়ন মূলত একই ধারণার ভিন্ন রূপ, যা বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোকে অস্বীকার করার শামিল। তাদের মতে, গণপরিষদ গঠন বা নতুন সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া অপ্রয়োজনীয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই তারা সংশোধনের মধ্য দিয়েই সব পরিবর্তন আনতে চায়।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বিএনপি নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে, সেভাবেই তারা এর সব দফা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।

তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়েও কথা বলেন, তবে “সার্বভৌম বিচার বিভাগ” ধারণার বিরোধিতা করেন। তার মতে, সার্বভৌমত্ব জনগণ, সংসদ ও রাষ্ট্রের—বিচার বিভাগের নয়।

এই বক্তব্য বিচার বিভাগের ক্ষমতার সীমা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের ইঙ্গিত দেয়, যা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে।

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের বক্তব্যে সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, সংবিধান ও নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা অস্বীকার করলে ভবিষ্যতে জুলাই সনদও অস্বীকৃত হতে পারে। তাই তিনি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দেন।

এখানে সরকারের মূল উদ্বেগ হলো—অতীতের বৈধতা অস্বীকার করলে ভবিষ্যতের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। ফলে তারা এমন কোনো পথ নিতে চায় না, যা বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

বিরোধী দলীয় শিবিরেও একধরনের চাপ ও বিভ্রান্তি লক্ষ করা গেছে। জামায়াতে ইসলামীর গাজী এনামুল হক অভিযোগ করেন, প্রস্তাবে ‘সংস্কার’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে, যা জনগণের সার্বভৌমত্বকে উপেক্ষা করার শামিল। অন্যদিকে এনসিপির আখতার হোসেন সরাসরি বলেন, প্রস্তাবটি উত্থাপনের যোগ্যই নয়।

এতে বোঝা যায়, শুধু সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যেই নয়, বিরোধী জোটের ভেতরেও মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।

বিএনপির শরিক দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থও বলেন, সংসদের নিয়ম মেনেই সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তার মতে, বিষয়টি নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে এবং বিএনপিকে “জুলাইবিরোধী” হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।

সংসদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—রাজনৈতিক অবিশ্বাস এখনো গভীর। বিএনপির মীর হেলাল উদ্দিন বলেন, জুলাই বাস্তবায়ন আদেশে গলদ রয়েছে এবং এটি জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপিকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।

এই ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে “মব কালচার” প্রসঙ্গ তুলে তিনি যে সতর্কতা দিয়েছেন, তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

সব পক্ষই যখন জুলাই সনদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছে, তখন প্রশ্ন ওঠে—সমঝোতা হচ্ছে না কেন? বিশ্লেষকদের মতে, মূল দ্বন্দ্বটি শব্দগত নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামো ও প্রক্রিয়াগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।

সরকার চায় সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনতে। এতে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। অন্যদিকে বিরোধী দল চায় একটি বৃহত্তর সংস্কার প্রক্রিয়া, যেখানে হয়তো বিদ্যমান কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন সামাজিক চুক্তি তৈরি করা সম্ভব।

এই দ্বন্দ্বটি মূলত ‘ইনক্রিমেন্টাল চেঞ্জ’ বনাম ‘স্ট্রাকচারাল রিফর্ম’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

সংসদে দ্বিতীয়বারের মতো আলোচনা শেষ হলেও কোনো ঐকমত্য না আসা ইঙ্গিত দেয়, বিষয়টি সহজে মীমাংসা হবে না। বরং আগামী দিনে এটি আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।

তবে আলোচনার ইতিবাচক দিক হলো—উভয় পক্ষই এখনো সংলাপের দরজা বন্ধ করেনি। বিরোধীদলীয় নেতা যেমন বলেছেন, “মনখোলা রাখলে এখনো রাস্তা বের করা সম্ভব”—এই বক্তব্যই হয়তো ভবিষ্যৎ সমঝোতার একমাত্র আশার জায়গা।

সবশেষে বলা যায়, সময় ফুরিয়ে গেলেও রাজনীতির ঘড়ি এখনো থেমে নেই। কিন্তু সমঝোতার পথে এগোতে হলে শুধু অবস্থান নয়, আস্থার সংকটও কাটাতে হবে। অন্যথায় জুলাই জাতীয় সনদ একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়েও বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তায় আটকে থাকতে পারে।

জুলাই জাতীয় সনদ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250