মঙ্গলবার, ৭ই এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৩শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** এক–এগারোর ‘সুবিধাভোগী’ সাংবাদিকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতে চায় সরকার *** চীন সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব *** জুলাই জাতীয় সনদ ঘিরে অনড় সরকার–বিরোধী দল, সমঝোতা নেই *** তারেক রহমান সরকারের প্রথম একনেক সভা *** মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে খেলাধুলার বিকল্প নেই: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী *** প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ *** নতুন সরকারের প্রথম একনেক বৈঠক আজ, অগ্রাধিকার পাচ্ছে ১৭ প্রকল্প *** নিষিদ্ধ করলেই রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের শক্তি বিলীন হয়ে যাবে না *** ইরানে যুদ্ধের প্রভাবে ভারতে কনডমের দাম বাড়তে পারে *** সোমবার ইরানের শেষ সুযোগ, মঙ্গলবার পাওয়ার প্ল্যান্ট গুঁড়িয়ে দেবেন ট্রাম্প

তাজু ভাই ২.০: ভাইরালের আড়ালে এক চরজীবনের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৫:৩৬ অপরাহ্ন, ৩১শে মার্চ ২০২৬

#

ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ব্রহ্মপুত্রঘেরা এক প্রত্যন্ত চর। সেখানে বসবাস করা ৩০ বছর বয়সী এক তরুণ—তাইজুল ইসলাম। কয়েক দিন আগেও তিনি ছিলেন সবার কাছে অচেনা, নিভৃত এক সংগ্রামী মানুষ। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছোট ভিডিও তাকে রাতারাতি পরিচিত করে তুলেছে ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে।

ভিডিওটি খুব সাধারণ—স্থানীয় বাজারে দাঁড়িয়ে জিলাপির দাম নিয়ে দোকানির সঙ্গে কথোপকথন। ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে নারায়ণপুর বাজারে মুঠোফোনে ধারণ করা সেই ভিডিওতে দেখা যায়, সরল ভাষায় তাইজুল জানতে চাইছেন, জিলাপির দাম সরকারি দরের সঙ্গে মিলছে কি না। ভাঙা-ভাঙা সংলাপ, অনাড়ম্বর উপস্থাপনা—সব মিলিয়ে ভিডিওটি যেন এক ধরনের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আর সেই সরলতাই ছুঁয়ে গেছে দর্শকদের মন।

কয়েক দিনের মধ্যেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ভিডিওটির ভিউ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৯ লাখ। একই সঙ্গে ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে তার ফেসবুক পেজের অনুসারীও বেড়ে গেছে চোখে পড়ার মতো—ছয় হাজার থেকে এখন প্রায় তিন লাখ। তবে এই ভাইরাল হওয়ার গল্পের আড়ালে রয়েছে ভিন্ন এক জীবনবাস্তবতা—সংগ্রাম, অভাব আর দায়িত্বে ভরা এক জীবন।

নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তাইজুল। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবেই তার কাঁধে পুরো সংসারের দায়ভার। ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনের কারণে বিদ্যালয়ের মুখ দেখা হয়নি তার। শিক্ষার সুযোগ না পেলেও জীবনের কঠিন পাঠ তিনি শিখেছেন বাস্তবতা থেকে।

সর্বশেষ ঢাকায় রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রমের ফাঁকে, ক্লান্তির ভেতরেও তিনি খুঁজে নিয়েছেন নিজের মতো করে বেঁচে থাকার একটি উপায়—ভিডিও তৈরি।

তাইজুল আজ মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ‘আমার মা–বাবা দুজনই অসুস্থ, তারা শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি কোনো সাংবাদিক না।’ কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে যেমন ছিল সরলতা, তেমনি ছিল গভীর বাস্তবতার ছাপ।

তবে শুধু বিনোদনের জন্য নয়, ভিডিও তৈরির পেছনে তার আরেকটি উদ্দেশ্যও আছে। নিজের চরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, বঞ্চনার গল্প তিনি তুলে ধরতে চান। কারণ তার ভাষায়, জেলা শহরের সাংবাদিকেরা খুব একটা যান না তাদের এলাকায়। তাই নিজের মতো করেই তিনি চেষ্টা করছেন সেই শূন্যতা পূরণ করতে। তিনি বলেন, ‘আমাদের চরের মানুষ অনেক কষ্টে থাকে। আমি চাই, বাইরের মানুষ এসব জানুক।’ তাইজুলের এই প্রচেষ্টা অনেকের কাছে নিছক বিনোদন হলেও, তার নিজের কাছে এটি যেন এক ধরনের দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ।

ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে যেমন প্রশংসা হয়েছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়েছে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও। তবে এসব নিয়ে খুব একটা বিচলিত নন তিনি। নিজেকে ‘বোকাসোকা মানুষ’ উল্লেখ করে তাইজুল বলেন, ‘ভুল হলে আমি স্বীকার করি। মানুষ হাসলে হাসুক, তাতে আমার কষ্ট লাগে না। আমি চাই, আমাদের এলাকার কথা সবাই জানুক।’

তার এই সরল স্বীকারোক্তি যেন তার ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন—নিরহংকার, অকপট।

তাইজুলের প্রতিবেশী এবং নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কবিরুল ইসলাম বলেন, তাইজুল কাজের পাশাপাশি নিয়মিত ভিডিও তৈরি করেন। তবে তার ভিডিও শুধু বিনোদনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর আড়ালে উঠে আসে এলাকার উন্নয়নবঞ্চনার বাস্তব চিত্র।

কবিরুল ইসলাম বলেন, ‘অনেকে নানা কিছু করে ভাইরাল হচ্ছেন। কিন্তু তাইজুল উন্নয়নবঞ্চিত এলাকার ভিডিও করে ভাইরাল হয়েছে, এটা আমাদের জন্য গর্বের।’

স্থানীয়দের কাছেও তাইজুল এখন গর্বের নাম। কারণ, তার মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তের মানুষ প্রথমবারের মতো জানতে পারছে তাঁদের চরজীবনের কথা—দুর্ভোগ, অবহেলা আর সংগ্রামের গল্প।

তাইজুলের গল্প তাই শুধু এক ভাইরাল ভিডিওর গল্প নয়। এটি এক প্রান্তিক মানুষের উঠে আসার গল্প, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চেষ্টা করছেন নিজের সমাজের কথা তুলে ধরতে।

জিলাপির দাম নিয়ে করা একটি সাধারণ ভিডিও তাকে এনে দিয়েছে পরিচিতি। কিন্তু এই পরিচিতিকে তিনি ব্যবহার করতে চান আরও বড় কিছুর জন্য—নিজ এলাকার মানুষের কথা জানানোর জন্য, তাদের জীবনমানের পরিবর্তনের আশায়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ‘তাজু ভাই ২.০’-এর ভিডিওর ধরণ বদলাবে, জনপ্রিয়তাও কমতে বা বাড়তে পারে। কিন্তু তার এই মানবিক চাওয়া—চরের মানুষের উন্নয়ন—তা থেকেই যাবে অটুট।

আর সেখানেই তাইজুল ইসলাম শুধু একজন ভাইরাল কনটেন্ট নির্মাতা নন, হয়ে ওঠেন এক প্রান্তিক কণ্ঠস্বর, যিনি নিজের মতো করে বলতে চান—“আমাদের কথাও শোনো।”

তাইজুল ইসলাম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250