ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চার প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চার প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। তারা সবাই বিএনপির মনোনীত প্রার্থী। তাদের একজন হলেন ঢাকা–৩ আসন থেকে জয়ী বিএনপির নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা। কেরানীগঞ্জ উপজেলার জিনজিরা, আগানগর, তেঘরিয়া, কোন্ডা ও শুভাঢ্যা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা–৩ আসন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৭৮৫ ভোট। বিশিষ্ট সাংবাদিক, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজাম বলছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের কাছে ব্যক্তিত্বের মূল্য মন্ত্রণালয়ের চেয়েও বড়।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গতকাল শনিবার রাতে দেওয়া এক পোস্টে নঈম নিজাম এসব কথা বলেন। তার ফেসবুক পোস্টটি এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তিনি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক জীবন ও ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন।
নঈম নিজাম লেখেন, "আমি তখন আজকের কাগজের পরে ভোরের কাগজে কাজ করি। বিএনপির ১৯৯১–৯৬ সালের সরকারের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সেই মন্ত্রণালয়ের একজন পূর্ণমন্ত্রী ছিলেন।"
তিনি বলেন, "গয়েশ্বর মন্ত্রণালয়ে বসেই বুঝতে পারলেন, পূর্ণমন্ত্রী থাকলে প্রতিমন্ত্রীর গুরুত্ব খুব সীমিত। কাজ করার ক্ষমতাও নেই। সব সিদ্ধান্তই নির্ভর করে মন্ত্রীর ওপর। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার দেওয়া প্রস্তাবগুলোও মন্ত্রী বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। এতে তার ব্যক্তিত্বে আঘাত লাগে। তিনি মন্ত্রণালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেন।"
নঈম নিজামের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। তিনি দায়িত্বে থাকলেও কার্যত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে না পারার বিষয়টি নিজের মর্যাদার পরিপন্থী হিসেবে দেখেছিলেন।
নঈম নিজাম বলেন, "কিছুদিন পর তিনি পদত্যাগপত্র পাঠান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী (খালেদা জিয়া) সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি। তবুও গয়েশ্বর আর মন্ত্রণালয়ে যেতেন না। তার পিএস ছিলেন আবদুল মান্নান ইলিয়াস। তিনি নিয়মিত অফিসে যেতেন।"
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও উল্লেখ করেন, "তার কক্ষে সচিবালয় বিটের সাংবাদিকদের প্রায়ই আড্ডা বসত। চা, কফির কাপে গল্প চলত। মাঝেমধ্যে কেউ জিজ্ঞেস করতেন, দাদা কি আবার অফিসে ফিরবেন? ইলিয়াস হেসে বলতেন, না, তিনি আর আসবেন না। তার কাছে ব্যক্তিত্বের মূল্য মন্ত্রণালয়ের চেয়েও বড়।"
রাজনীতিতে ব্যক্তিত্ব ও নীতিগত অবস্থানকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়—গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ক্ষমতা ও পদকে কেন্দ্র করে নানা সমঝোতা ও আপসের অভিযোগ ওঠে, সেখানে এই ধরনের উদাহরণ অনেকের কাছে ব্যতিক্রম হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিজয়ও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করা চারজনের একজন হিসেবে তার এই অর্জন রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছে।
নঈম নিজামের ফেসবুক পোস্টে উঠে আসা এই স্মৃতিচারণ শুধু একটি ঘটনার বিবরণ নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। যেখানে ক্ষমতার চেয়ে ব্যক্তিত্ব, পদমর্যাদার চেয়ে আত্মমর্যাদা বড় হয়ে ওঠে।
রাজনীতির বাস্তবতায় এমন অবস্থান কতটা কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য—সে নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এই অবস্থান যে তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলে ধরেছে, সে বিষয়ে দ্বিমত কমই রয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন