শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আলোচনা-সমালোচনায় মাহবুব মোর্শেদের অনিয়ম ও দুর্নীতি *** দেশে কাশি আর জাপানে হাসি, মেটিকুলাস নকশার রূপ: মুজতবা দানিশ *** বৈশ্বিক সংকটের ছায়ায় রাজপথের রাজনীতি, সংকট বাড়ার শঙ্কা *** উৎপাদন থাকলেও কেন পেট্রোল-অকটেন সংকট? *** সাংবাদিক তানবিরুল মিরাজকে হয়রানি বন্ধের আহ্বান সিপিজের *** শক্তিশালী সরকারকে হটানো গেছে, এই সরকারকেও হটানো সম্ভব: শহিদুল আলম *** শহিদুল আলমের গতিবিধি নিয়ে প্রশাসনের সন্দেহ *** গাড়ির জ্বালানি ৩০ শতাংশ কম নেবেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা *** নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে *** ভারত কি পারবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন খ্রিষ্টান রাষ্ট্র গঠন ঠেকাতে?

বৈশ্বিক সংকটের ছায়ায় রাজপথের রাজনীতি, সংকট বাড়ার শঙ্কা

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

বিশ্ব যখন এক অস্থির সময় অতিক্রম করছে, তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়ানোর আভাস দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়—এটি ক্রমেই বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বরং আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোর কারণে দেশ এই সংকটের অভিঘাতে আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে দেশের ভেতরে সংবিধান সংস্কার ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতি—বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সক্রিয়তা—একটি নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে: এখন কি রাজপথের রাজনীতি করার সময়, নাকি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার সময়?

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্থির। সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশ, যার জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি, ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত ও পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ অনুভব করছে।

এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সংকট ব্যবস্থাপনা—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এই মুহূর্তে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দায়িত্ব হলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল না করা।

দেশে দীর্ঘ সময় পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার গঠিত হয়েছে, সংসদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং বিরোধী দলও সক্রিয় রয়েছে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর এই পুনর্গঠন অনেকের কাছেই ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত।

কিন্তু এই প্রেক্ষাপটেই সংবিধান সংস্কার ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। গণভোট, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, অধ্যাদেশ বাতিল—এসব বিষয় ঘিরে এক ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজপথে কর্মসূচির ঘোষণা।

বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্রদের বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর মতে, সংবিধান সংস্কারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাস্তায় নয়, আলোচনার টেবিলেই সমাধান হওয়া উচিত। তার ভাষায়, “এ ধরনের ইস্যুতে কয়েক মাস দেরি হলে বড় কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু এই মুহূর্তে আন্দোলন সংকটকে বাড়িয়ে দিতে পারে।”

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদও একই সুরে কথা বলেন। তিনি মনে করেন, বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো এমন আচরণ করা, যাতে নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার জোর দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যের ওপর। তার মতে, “এই সংকটের সময় ঐক্যবদ্ধ থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি। মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তা সমাধান করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে, রাজপথে নয়।”

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. সাব্বির আহমেদ বিষয়টিকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, যা বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই সমাধান করা সম্ভব। এ অবস্থায় রাজপথে আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সরকারের সমালোচনা করবে, বিকল্প প্রস্তাব দেবে, জনস্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ভূমিকা পালনের পদ্ধতি কী হবে? বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি বিরোধী শক্তি—বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী—রাজপথে আন্দোলনে নামে, তাহলে তা কেবল রাজনৈতিক উত্তেজনাই বাড়াবে না, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

কারণ, আন্দোলন মানেই সম্ভাব্য সংঘর্ষ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যবস্থায় বিঘ্ন। এমনিতেই জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প খাত চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

ইতিহাস বলে, সংকটকালে জাতীয় ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—যে কোনো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনৈতিক বিভাজন নয়, বরং সমন্বয়ই কার্যকর ভূমিকা রাখে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও তেমনই একটি সময়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে—জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। সরকারের উচিত এখনই বিকল্প জ্বালানি উৎস, নবায়নযোগ্য শক্তি, এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে ভাবা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।

এই বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন। বিরোধী দল এখানে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে—প্রস্তাব দিয়ে, সমালোচনা করে, বিকল্প পথ দেখিয়ে।

দেশ বর্তমানে একটি সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈশ্বিক সংকট, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন। এই দুইয়ের সমন্বয়ে পরিস্থিতি যেকোনো সময় জটিল রূপ নিতে পারে।

এমন বাস্তবতায় রাজপথের আন্দোলন—বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর মতো বিরোধী শক্তির—পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। এটি শুধু সরকারের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

বরং এখন প্রয়োজন দায়িত্বশীল রাজনীতি। প্রয়োজন সংলাপ, সমঝোতা ও দূরদর্শিতা। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ, সংকটের সময় বিভাজন নয়—ঐক্যই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।

রাজপথের রাজনীতি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250