ফাইল ছবি
দেশে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ কিছুটা বেড়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসকেরা রোববার সুখবর ডটকমকে বলেছেন, সময়মতো চিকিৎসা পেলে অধিকাংশ শিশুই সুস্থ হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সারাদেশেই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা থাকলেও এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এবং হাসপাতালগুলোতে আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল রোববার গণমাধ্যমে বলেন, “মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং এরপর ভ্যাকসিন কোনো গভর্নমেন্ট দেয়নি।” তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন করে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা টিকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, “ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন চলে আসছে। আরও যা যা লাগবে সেটি টিকার জন্য গঠিত বৈশ্বিক জোট গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। তারা মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২ কোটি সিরিঞ্জ দিবে। সবকিছু একত্রিত হলেই আমরা ক্যাম্পেইন (বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি) শুরু করবো।”
আগামী জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও শিশু বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, হামের বর্তমান প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে—পর্যাপ্ত টিকাদান না হওয়া, শিশুদের মায়ের বুকের দুধ কম খাওয়ানো, কৃমিনাশক ওষুধ না নেওয়া এবং অপুষ্টি।
শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, “সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা পায় শিশুরা। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে যারা আক্রান্ত তাদের ৩৩ ভাগ এই বয়সের আগেই আক্রান্ত হয়েছে।” ফলে বিশেষজ্ঞেরা টিকাদানের সময়সীমা আরও এগিয়ে আনার বিষয়েও ভাবনার কথা বলছেন।
এ ছাড়া নিয়মিত টিকার পাশাপাশি প্রতি চার বছর পরপর যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়, সেটি ২০২০ সালের করোনা পরিস্থিতি এবং ২০২৪ সালের নানা কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। এতে করে কিছু শিশুর টিকার আওতার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংক্রমণ বাড়লেও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বড় ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালে বিশেষ কর্নার খোলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হোসেইন মো. মইনুল আহসান বলেন, “বড় দশটি মেডিকেল কলেজে আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সব আইসিউতে এসব রুগীকে চিকিৎসা দেওয়া যায় না। তাই আলাদা করে আইসিউর ব্যবস্থা করা হচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে।”
ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছরের শুরু থেকে চার শতাধিক রোগী হাম সন্দেহে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ায় বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলেন, হামে আক্রান্ত হলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।“এর প্রথম পর্যায়ে অনেক জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল ও আলো সহ্য করতে না পারার মতো উপসর্গ দেখা দেয়,” বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা গেলে হাম পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। তাই অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে শিশুদের টিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং হাসপাতাল প্রস্তুতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ভ্যাকসিন ও সিরিঞ্জ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে, হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি উদ্বেগের হলেও সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও সচেতনতা বাড়ালে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।
খবরটি শেয়ার করুন