ছবি: সংগৃহীত
সরবরাহে ঘাটতি খুব সামান্য। মজুত নিয়েও আপাতত বড় দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। এরপরও সারাদেশের তেলের পাম্পগুলোতে এক মাস ধরে যেনে ‘হাহাকার’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহল ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, মূলত দুর্বল পরিকল্পনা, তথ্যের ঘাটতি, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাপর্যায়ে কিছু মজুতদারিতে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সরবরাহ নিয়ে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও দাম বাড়ানোর আশঙ্কা।
তবে এক মাসের মাথায় এসে সরকারের নেওয়া কঠোর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে কিছু কিছু এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার কথা জানাচ্ছেন তেল ব্যবসায়ীরা।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রোববার বলেন, ‘এই এক মাসে আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। সরকারের অনেক দায়িত্বশীল পর্যায়েও বিষয়টি বুঝতে খানিকটা সময় লেগেছে। সারা দেশের তেল ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। অচিরেই দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাবে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ৫৬ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলারে পৌঁছে। যদিও পরে কিছুটা কমেছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে জ্বালানি নিয়ে সংকট শুরু হয়। যানবাহনের দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় পাম্পের সামনে। সরকার প্রথম দিকে রেশনিংয়ের পদক্ষেপ নিলেও পরে তা তুলে দেওয়া হয়। সরকার দাবি করে, সরবরাহ বা মজুতে কোনো সংকট নেই। এরপরও পাম্পের সামনের চিত্র আগের মতোই।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হিসাবমতে, চলতি মার্চ মাসে গত বছরের মার্চের তুলনায় ডিপো থেকে তেল সরবরাহ তুলনামূলক কমেছে খুব সামান্যই। গত বছর মার্চের ৩১ দিনে ৩৬ হাজার ৯০০ টন অকটেন সরবরাহ করা হলেও চলতি মার্চের ২৮ তারিখ পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে ৩৪ হাজার টন। গত মার্চে ৪৬ হাজার টন পেট্রল সরবরাহ হয়, চলতি মার্চের ২৮ দিনে হয়েছে ৩৮ হাজার টন। গত মার্চে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ হয়েছিল। আর চলতি মার্চের ২৮ দিনে হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার টন।
চট্টগ্রামের একটি পাম্পের মালিক মঈন উদ্দিন জানান, গত বছর যে পরিমাণ তেল দেওয়া হয়েছিল, এবারও হয়তো সে পরিমাণই দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আতঙ্কের কারণে হোক, কিংবা ভোক্তাপর্যায়ে মজুতের কারণে হোক, চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। সে কারণে সংকট দূর হচ্ছে না।
গত শুক্রবার ছুটির দিনেই সারাদেশের ডিসি ও তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ হাতে নেয় জ্বালানি মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত উদ্ধার ও কালোবাজারি চিহ্নিত করতে সারা দেশে অভিযান। এ ছাড়া পেট্রলপাম্প পর্যায়ে সম্ভাব্য অনিয়ম রোধে পাম্পগুলোতে একজন করে ট্যাগ অফিসার বা তদারক কর্মকর্তা নিয়োগ। ইতিমধ্যেই সরকারি ডিপো, বাণিজ্যিক পেট্রলপাম্প ও ব্যক্তিপর্যায়ে বড় রকমের অবৈধ মজুত চিহ্নিত করে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দিনে সারাদেশে ২৪২২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জ্বালানি তেল নিয়ে নানা ধরনের অনিয়মের কারণে ৬৭১টি মামলা এবং ৫৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ সময়ে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে অন্তত ১২ জনকে। এসব অভিযানে সারাদেশে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল আলম বলেন, ট্যাগ অফিসার নিয়োগের পর তারা সব পর্যবেক্ষণ করছেন। কিন্তু মোটরসাইকেলগুলোকে দেখা যাচ্ছে তারা লাইন ধরে এসে ২/৩ লিটার তেল নিচ্ছে। তাদের টাংকিতে জায়গা থাকে না। তবুও তেল নিতে আসে। এতে বোঝা যায়, ক্রেতাদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক রয়ে গেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘যুদ্ধবিগ্রহের সময় জ্বালানি সংকট হবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা এর আগ থেকেই অভ্যন্তরীণ কারণে জ্বালানি সংকটে ছিলাম।’
এই অধ্যাপকের মতে, সরকার এখন যে ব্যবস্থাগুলো নিচ্ছে সেগুলো সাময়িক। হরিলুট হওয়ার মতো পরিস্থিতি চলছে। তেল কালোবাজারে চলে গেছে। সরকারের দুর্বলতার কারণেই এমন হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে হয়। কারণ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে না পারলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে।
খবরটি শেয়ার করুন