ফাইল ছবি
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ব্যাপক আলোচিত হওয়া ও পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়ার দীর্ঘ পনের বছর পর আবার পুলিশের চাকরি ফেরত পাওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগের বরখাস্ত আদেশ বাতিল করে তাকে বকেয়া বেতন ভাতাসহ চাকরিতে পুনর্বহাল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।
কোহিনূর মিয়া চাকরিতে পুনর্বহালের খবরে পুলিশের মধ্যে গুঞ্জন উঠেছে, পরবর্তী ডিএমপি কমিশনার হিসেবে তিনিই নিয়োগ পাচ্ছেন। কারণ, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কোহিনূর তৎকালীন সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাকে কোণঠাসা করে। একপর্যায়ে সরকারের চাপে জীবনের নিরাপত্তায় তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার কয়েক বছরের মধ্যেই আলোচিত হয়ে উঠেছিলেন তখনকার পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়া। ওই আমলে একসময় তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার ছিলেন।
বিসিএস ১২ ব্যাচের এই কর্মকর্তা ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার হিসেবেও কাজ করেছেন। এই ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদায় রয়েছেন বা অবসরে গেছেন।
তবে ২০০২ সালের জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে গভীর রাতে পুলিশি অভিযানের ঘটনায় তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিলেন। ওই ঘটনার জেরে তীব্র আন্দোলনের মুখে তখনকার উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। বিএনপি সরকারের সময়েই তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছিল। যদিও এসব মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন।
পরে ২০০৯ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোহিনূর মিয়াকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর দুই বছর পর ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এখন আবার সরকার তাকে পুলিশের চাকরিতে ফিরিয়ে আনার পর এ নিয়ে আলোচনা- সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
এদিকে দেশের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে অবসরপ্রাপ্ত বা বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল বা দায়িত্বে ফেরানোর বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, আলোচিত-সমালোচিত কোহিনূর মিয়াকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের পর বিষয়টি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত একদিকে প্রশাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে অনেক কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসর, বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তন বা নীতিগত পরিবর্তনের ফলে তাদের কেউ কেউ আবার দায়িত্বে ফেরার সুযোগ পান। কোহিনূর মিয়াকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনা সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনা হলে প্রশাসনে দক্ষতা বাড়তে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকা কর্মকর্তারা পুনর্বহাল হলে প্রশাসনের কাজে গতি আসে। তবে এ ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, “যদি পুনর্বহাল প্রক্রিয়া নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছভাবে হয়, তাহলে এতে প্রশাসন উপকৃত হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেলে সেটি প্রশাসনের পেশাদারত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, অবসর বা বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত প্রশাসনের ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা বর্তমান কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বা দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল করা হয়, তাহলে প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সরকার–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্রের প্রয়োজন ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনায় নিয়েই পুনর্বহাল বা দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি দেখা হয় বলে দাবি তাদের।
এদিকে কোহিনূর মিয়াকে ঘিরে চলমান আলোচনা প্রশাসনিক সংস্কার ও জবাবদিহির প্রশ্নকেও সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হলে বিতর্ক কমবে এবং প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা বাড়তে পারে।
কোহিনূর মিয়াকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে মূলত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদায়ন–নীতি এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক কাজ করছে। বিভিন্ন মহলে কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরা হচ্ছে, যেগুলোর কারণে তার নাম আলোচনায় এসেছে।
১. সমালোচনার বড় কারণ হলো—অবসরপ্রাপ্ত বা বরখাস্ত হওয়া একজন কর্মকর্তাকে আবার প্রশাসনে সক্রিয়ভাবে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি। প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে অবসর বা অপসারণের পর পুনর্বহাল বিরল ঘটনা।
তাই কোহিনূর মিয়াকে ঘিরে এই প্রশ্ন উঠেছে—কোন প্রক্রিয়ায় এবং কী বিবেচনায় তাকে আবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, যদি এই ধরনের সিদ্ধান্তের স্পষ্ট নীতিমালা না থাকে, তাহলে তা প্রশাসনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
২. কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, অবসরপ্রাপ্ত বা বিতর্কিতভাবে অপসারিত কর্মকর্তাদের আবার দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হলে প্রশাসনের পেশাদার কাঠামোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ এতে বর্তমান কর্মরত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৩. সমালোচনার আরেকটি বড় দিক হলো রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনে পুনর্বহাল বা গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করে, তাহলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই কারণেই কোহিনূর মিয়াকে ঘিরে আলোচনায় প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার বিষয়টি বারবার সামনে আসছে।
৪. কোহিনূর মিয়াকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ কেউ তার অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে এটিকে প্রশাসনিক নীতির প্রশ্ন হিসেবে তুলছেন। এই বিতর্কের ফলে বিষয়টি মূলধারার গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বিতর্ক এড়াতে হলে প্রশাসনে নিয়োগ ও পুনর্বহালের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
কোহিনূর মিয়া প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ সময় সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। প্রশাসনিক মহলে তিনি একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত হলেও তার ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে কিছু বিতর্ক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যান বা অবসরে যান বলে জানা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকার প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পুনরায় দায়িত্বে আনার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে—এমন আলোচনা শুরু হওয়ার পর কোহিনূর মিয়ার নাম সামনে আসে। এতে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—কোন প্রক্রিয়ায় এবং কী বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত?
সার্বিকভাবে কোহিনূর মিয়াকে ঘিরে আলোচনা শুধু একজন কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে নয়; বরং এটি প্রশাসনের কাঠামো, নীতিমালা ও পেশাদারত্বের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন