মঙ্গলবার, ১০ই মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৬শে ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** এবার ইরান ছুড়ছে ১ টনের মিসাইল, বদলে গেল যুদ্ধক্ষেত্র *** প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন: হর্ষবর্ধন শ্রিংলা *** জুলাই সনদ আদেশ ম্যাস্কুলিন না ফেমিনিন জেন্ডার, আমি জানি না: সালাহউদ্দিন *** ‘আওয়ামী লীগের সাবেক এমপির জামিনের জন্য এক কোটি টাকা চান প্রসিকিউটর’ *** জামায়াত আমিরের ‘সম্মতি ছাড়া’ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি, উপদেষ্টাকে অব্যাহতি *** তোফাজ্জলকে পিটিয়ে হত্যা: ঢাবির ২২ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা *** যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি কার্যকর হলে বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি হবে ১,৩২৭ কোটি: সিপিডি *** শফিকুর রহমানের প্রস্তাবের সমালোচনা করছেন কূটনীতিকেরা *** ঈদে পূর্ণ ছুটি পাচ্ছেন না সব ব্যাংক কর্মকর্তা, খোলা থাকবে যেসব এলাকায় *** ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

‘আওয়ামী লীগের সাবেক এমপির জামিনের জন্য এক কোটি টাকা চান প্রসিকিউটর’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:৩২ অপরাহ্ন, ১০ই মার্চ ২০২৬

#

আওয়ামী লীগের কারাবন্দী একজন সাবেক রাজনীতিককে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবারের কাছে ১ কোটি টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) একজন প্রসিকিউটর (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী)। হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ডিংয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। রেকর্ডিংগুলো সংগ্রহ করেছে প্রথম আলো ও নেত্র নিউজ।

রেকর্ডিংগুলোয় চট্টগ্রাম-৬ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে করা মামলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রসিকিউটরদের একজনের কথোপকথন রয়েছে। এই প্রসিকিউটরের নাম মো. সাইমুম রেজা তালুকদার। জামিনের বিষয়ে তিনি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় কথা বলেছেন। প্রথম আলো ও নেত্র নিউজ রেকর্ডিংগুলো যাচাই করে দেখেছে।

ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের লেখা বিশেষ প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। তার লেখাটি আজ মঙ্গলবার (১০ই মার্চ) প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে, 'প্রথম আলো-নেত্র নিউজ যৌথ অনুসন্ধান: কথোপকথন ফাঁস, জামিনের জন্য এক কোটি টাকা চান প্রসিকিউটর' শিরোনামে।

ডেভিড বার্গম্যান প্রতিবেদনে জানান, এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের দাবি, সাবেক এই সংসদ সদস্যকে আটকের প্রায় দুই মাস পর গত বছরের এপ্রিলে প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার প্রথম তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা জানান, ওই প্রসিকিউটর তাদের বলেছিলেন, অর্থের বিনিময়ে তিনি ফজলে করিম চৌধুরীর জামিন নিশ্চিত করতে পারবেন। তদন্ত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি পেতেও সহায়তা করতে পারবেন তিনি। শুরুর দিকের সেই কথোপকথনগুলো রেকর্ড করা হয়নি বলে পরিবারটি জানিয়েছে।

পরিবারের দাবি, পরবর্তী আলাপগুলোয় সাইমুম রেজা তাদের আইসিটির একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে টাকা দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। সাইমুমের দাবি, ওই কর্মকর্তা ফজলে করিম চৌধুরীর বিচারের দাবি করে আসা মুনিরিয়া নামে একটি ধর্মীয় সংগঠন থেকে ঘুষ নিয়েছেন। মুনিরিয়া টাকা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তদন্ত কর্মকর্তাও অর্থ গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

২০২৫ সালের শেষের দিকে পরিবারটি সাইমুম রেজার সঙ্গে তাদের কথোপকথন রেকর্ড করা শুরু করে বলে জানিয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, সাইমুম রেজা মোট ২৬ বার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এবং নিজে অন্তত ১৪ বার ঘুষ চেয়েছেন।

পরিবারটিকে তিনি এই কথোপকথন দিয়ে ১ কোটি টাকা এবং ১০ বা ২০ লাখ টাকার কিস্তি বুঝিয়েছিলেন—পরবর্তী কথোপকথনগুলোয় এ বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল। উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার সাইমুম রেজা তালুকদার প্রসিকিউটরের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এদিকে সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আজ নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নবনিযুক্ত চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, সদ্য পদত্যাগ করা এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ বিচার প্রক্রিয়াকে ‘শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ’ করে। কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া অনিবার্যভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ইমেজ সংকট হয়। তবে আমি আগেই বলেছিলাম যে আমার কর্মকালে কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ন্যূনতম দুর্নীতির অভিযোগ এলে বরদাশত করা হবে না। বৈঠক করে প্রত্যেক প্রসিকিউটরকে আমি একই কথা বলেছি।’

সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এমন একটি সংবাদ দেখেছি। এটা গুরুতর অভিযোগ। এমন কিছু আমাদের কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠার কথা ছিল না। যখন উঠেছে তাৎক্ষণিকভাবে এটার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। আমরা এটা প্রশ্রয় কেন দিয়েছি, জানি না। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ আসেনি। এলে আমরা অভ্যন্তরীণ তদন্ত করব।’

আইনজ্ঞেরা বলছেন, আসামির জামিনের বিনিময়ে প্রসিকিউটরের ঘুষ চাওয়ার কথোপকথন ফাঁসের ঘটনায় বিচারব্যবস্থায় জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি। প্রতিবেদনটি কেবল একটি ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ নয়; বরং এটি বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলার পরিচালনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

প্রথম আলো ও নেত্র নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ কলের একাধিক অডিও রেকর্ডিং পাওয়া গেছে। এসব কথোপকথনে তিনি চট্টগ্রাম–৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের কাছে জামিন নিশ্চিত করার জন্য এক কোটি টাকা দাবি করেছেন।

রেকর্ডিংয়ে তিনি অগ্রিম হিসেবে অন্তত ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথাও বলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর তাদের সঙ্গে অন্তত ২৬ বার যোগাযোগ করেন এবং একাধিকবার অর্থ দাবি করেন।

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এই প্রতিবেদন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সাংবাদিকেরা কেবল অভিযোগ তুলে ধরেননি; বরং অডিও রেকর্ডিং যাচাই করে ঘটনাটির সত্যতা অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন।

গণমাধ্যমের এই ধরনের অনুসন্ধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সামাজিক নজরদারি তৈরি করে। বিশেষ করে বিচারব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটি বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো প্রতিষ্ঠান সাধারণত অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলার বিচার করে। ফলে এখানকার কোনো কর্মকর্তা বা প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর সন্দেহের ছায়া ফেলতে পারে।

বিশেষ করে যখন মামলা রাজনৈতিকভাবে আলোচিত ব্যক্তিদের ঘিরে হয়, তখন এ ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্ককেও আরও উসকে দেয়। তাছাড়া ঘুষ চাওয়ার ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন জুলাই আন্দোলন–সংক্রান্ত সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলো নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে যদি বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কারও বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, তবে তা মামলার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষ তদন্ত। যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা বিচারব্যবস্থার ভেতরে দুর্নীতির একটি গুরুতর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও স্পষ্ট করা জরুরি, যাতে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন না হয়।

বিচারব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি অর্থের বিনিময়ে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে, তবে তা পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ আরও সংবেদনশীল। এখানকার কোনো বিতর্ক বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলতে পারে।

যদি কোনো রাজনৈতিকভাবে আলোচিত মামলার সঙ্গে যুক্ত প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

বিচারব্যবস্থা একটি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক প্রতিষ্ঠান। জনগণ আদালতের ওপর আস্থা রাখে এই বিশ্বাসে যে সেখানে আইনের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ বিচার হবে। কিন্তু যদি বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কোনো কর্মকর্তা বা আইনজীবীর বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে, তবে তা জনগণের আস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ডেভিড বার্গম্যান এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250