ছবি: সংগৃহীত
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দীর্ঘপ্রতীক্ষিত সরাসরি অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি কেবল ইসরায়েল অভিমুখে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ছুড়েই ক্ষান্ত হবে না কি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করে দেবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য। যদি ইরান হরমুজ প্রণালি এবং হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাণিজ্যে বিপর্যয় নেমে আসবে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করা শিয়া মতাদর্শী হুথিরা ইসরায়েলবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত হলেও এতকাল তারা ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামেনি। গত বছরের আগস্টে ইসরায়েলি গোয়েন্দা হামলায় তাদের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হলেও গোষ্ঠীটি তাদের সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ওমানের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের মে মাস থেকে মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ রাখার একটি যুদ্ধবিরতি চললেও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে হুথিরা কখনোই সেই নমনীয়তা দেখায়নি। এখন ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার প্রেক্ষাপটে তারা সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনায় হামলা শুরু করেছে।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফারিয়া আল-মুসলিম সতর্ক করেছেন যে লোহিত সাগরে হুথিদের অব্যাহত আক্রমণের ফলে জাহাজ চলাচলের খরচ এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা এমনিতেই ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি করছে। হুথিদের এই পদক্ষেপকে আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার ইরানি কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে হুথিদের এই যুদ্ধযাত্রার পেছনে কিছু অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সমীকরণও কাজ করছে। একদিকে তারা সৌদি আরবের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধার প্রত্যাশা করছে, অন্যদিকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখতে চায়। সৌদি আরব বর্তমানে ইয়েমেনের দক্ষিণ অংশের নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি বজায় রাখতে হুথিদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে সমঝোতা করতে আগ্রহী হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত হুথিদের প্রকৃত শক্তি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ায় নয়, বরং সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ করার ক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।
জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই উত্তেজনা ইয়েমেনকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অতল গহ্বরে টেনে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। এর ফলে এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া কেবল দীর্ঘায়িতই হবে না, বরং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক সংকট চরম সীমায় পৌঁছাবে।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন