ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চল—দূরত্ব, দারিদ্র্য আর অবহেলার এক চেনা বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার ভেতর থেকেই উঠে এসেছেন তাইজুল ইসলাম (৩০)। পেশায় রাজমিস্ত্রির সহকারী, জীবনের প্রয়োজনে ঢাকায় কাজ করেন।
কিন্তু অবসরের ফাঁকে ফাঁকে মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন—কখনো মজা করে, কখনো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে। সম্প্রতি জিলাপির দাম নিয়ে করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন তিনি।
তাইজুল নিজেকে সাংবাদিক দাবি করেন না। বরং সরল স্বীকারোক্তি—“আমি সাংবাদিক না, পরিবারের দুঃখ-কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি।” তার এই কথার মধ্যেই যেন ধরা পড়ে জীবনের এক গভীর সত্য—কষ্ট ভুলে থাকার এক সহজ উপায় হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন ক্যামেরা আর কথোপকথন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর ইউনিয়নের উত্তর ঢাকডহর সরকারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তাইজুল। বাবা সিরাজুল ইসলাম ও মা তাহেরা বেগম—দুজনই অসুস্থ, পাশাপাশি শ্রবণপ্রতিবন্ধী। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি বড়। পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন। অনিশ্চিত আয়, কষ্টকর শ্রম আর পরিবারের দায়—সব মিলিয়ে তার জীবন সংগ্রামের।
এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই জন্ম নেয় তার ভিডিও করার অভ্যাস। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজের ফাঁকে ফাঁকে মোবাইল ফোনে ধারণ করেন ছোট ছোট ভিডিও। বিষয় খুব সাধারণ—কোনো দোকানে গিয়ে পণ্যের দাম জিজ্ঞেস করা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, কিংবা নিজের মতো করে কোনো পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা।
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি দোকানে গিয়ে তিনি জিলাপির দাম জানতে চাইছেন। তার ভাষা একেবারেই গ্রামীণ, সরল এবং অপ্রস্তুত। তিনি বলেন, “অনেক এখানে দোকানপাট, অনেক জিলাপি ভাজতেছে। তার কাছে আমি প্রশ্ন করবো—জিলাপি কত করে বিক্রি করছেন? সাদাডা কত, লালডা কত?”
এরপর দোকানিকে উদ্দেশ করে বলেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে? যদি জনগণকে বলতেন তাহলে অনেক খুশি হইতাম।”
এই কথাগুলোতেই দর্শকের দৃষ্টি আটকে যায়। কেউ তার এই সরল উপস্থাপনাকে বিনোদন হিসেবে নিয়েছেন, কেউবা প্রশংসা করেছেন তার নির্ভেজাল ভঙ্গির। আবার কেউ কেউ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চিরচেনা দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া—প্রশংসা ও ট্রোল—দুটোই এসেছে তার দিকে।
তবে এসব প্রতিক্রিয়া নিয়ে খুব বেশি ভাবিত নন তাইজুল। তিনি মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, “আমি বোকাসোকা মানুষ, আমার ভুল হতেই পারে। আপনারা আমাকে নিয়ে ট্রোল করেন, এতে আমার কষ্ট নেই।”
তার এই স্বীকারোক্তি যেমন বিনয়ী, তেমনি এক ধরনের আত্মবিশ্বাসও প্রকাশ করে—নিজেকে নিয়ে অস্বস্তি নেই, বরং নিজের মতো করে থাকতে চান।
ভিডিও করার পেছনে তার আরেকটি উদ্দেশ্যও আছে। তিনি মনে করেন, তাদের চরাঞ্চলের খবর খুব কমই প্রচারমাধ্যমে আসে। “সাংবাদিকরা আমাদের এলাকার খবর করে না। এ জন্য আমি ভিডিও করি,”—বলছিলেন তিনি। তার এই বক্তব্যে এক ধরনের বঞ্চনার অনুভূতি ফুটে ওঠে, যা দেশের প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়।
তাইজুলের ভিডিও হয়তো পেশাদার নয়, তথ্য যাচাইয়ের কঠোর মানদণ্ডও নেই। কিন্তু তার ভিডিওতে আছে বাস্তবতা, সরলতা আর মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের চেষ্টা। তিনি কোনো স্ক্রিপ্ট মেনে চলেন না, অভিনয়ও করেন না। যা দেখেন, যেমন ভাবেন, তেমনই তুলে ধরেন। এই নির্ভেজাল দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আলাদা করে দিয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি এখন জানতে শুরু করেছেন। নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাইজুলের বাড়ি তার পরিষদের সামনেই, তবে ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না। এই মন্তব্যও যেন তুলে ধরে—প্রান্তিক একজন মানুষের গল্প অনেক সময় তার আশপাশের মানুষদের কাছেও অজানা থেকে যায়, যতক্ষণ না তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরির একটি বড় অংশই পরিকল্পিত, সাজানো বা কৃত্রিম। সেখানে তাইজুলের মতো একজন মানুষের উপস্থিতি ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। তিনি কোনো আলোচিত ইস্যু তৈরি করতে চান না, বরং নিজের অভিজ্ঞতা আর চারপাশের সাধারণ দৃশ্য তুলে ধরেন। এই সরলতাই অনেকের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
একই সঙ্গে এটাও সত্য, সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়া যেমন সহজ, তেমনি তা ধরে রাখা কঠিন। বিশেষ করে যখন তা আসে হঠাৎ করে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই। তাইজুল সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রশংসার পাশাপাশি কটাক্ষও তাকে শুনতে হচ্ছে। তবে তার কথায় বোঝা যায়, তিনি খুব বেশি প্রত্যাশা নিয়ে এই পথে হাঁটছেন না।
“আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক”—এই একটি বাক্যেই যেন তার সব উদ্দেশ্য স্পষ্ট। নিজের কষ্ট ভুলতে ভিডিও করা শুরু করলেও, এখন সেই ভিডিওর মধ্য দিয়ে নিজের এলাকার কথাও বলতে চান তিনি।
তাইজুল ইসলাম কোনো পেশাদার সাংবাদিক নন, নিজেও তা দাবি করেন না। কিন্তু তার মধ্যে যে প্রশ্ন করার সাহস, মানুষের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ এবং নিজের বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা—তা এক ধরনের সামাজিক গুরুত্ব বহন করে। অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার ভেতরে যে বিষয়গুলো আড়ালে থেকে যায়, সেগুলোই এমন সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে।
তাইজুলের গল্প তাই কেবল একজন ভাইরাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরের গল্প নয়; এটি প্রান্তিক জীবনের সংগ্রাম, স্বপ্ন আর আত্মপ্রকাশের এক মানবিক গল্প। যেখানে কষ্ট আছে, কিন্তু আছে তা জয় করার সহজ, নির্ভেজাল এক চেষ্টা—একটি মুঠোফোন আর কিছু সরল প্রশ্নের মাধ্যমে।
খবরটি শেয়ার করুন