ফাইল ছবি
বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১ সাল একটি নির্মম বাস্তবতার প্রতীক। হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও নির্যাতনের মতো অসংখ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের স্মৃতি আজও জাতিকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন কখনোই স্তিমিত হয়নি।
বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে—বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর দায় স্বীকার ও ‘ক্ষমা চাওয়ার’ রাজনীতি নিয়ে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) ও জামায়াতে ইসলামীর নাম উঠে আসে।
এর মধ্যে একমাত্র জামায়াতই এখনো সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে। যুদ্ধকালীন দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
যদিও জামায়াত নেতারা পরবর্তীতে দাবি করেছেন, তাদের অবস্থান ছিল ‘রাজনৈতিক’, বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণা বলছে, এই সহযোগিতা ছিল সুসংগঠিত এবং কাঠামোবদ্ধ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রণীত ‘দালাল আইন’-এর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং জামায়াতসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে ১৯৭৩ সালের সাধারণ ক্ষমা এবং ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই বিচার প্রক্রিয়া কার্যত থেমে যায়। ১৯৭৬ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে জামায়াতের রাজনীতিতে ফেরার পথ খুলে যায়। ১৯৭৯ সালে দলটি আবার সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশ নিতে শুরু করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপির মতো প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো মুখে জামায়াতের সমালোচনা করেছে। আবার ক্ষমতার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন বা নির্বাচন করেছে।’ তার মতে, এই দ্বিমুখী অবস্থান জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করেছে এবং তাদের ওপর দায় স্বীকারের চাপ তৈরি হতে দেয়নি।
একাত্তরের দায় স্বীকারের প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বরাবরই অস্পষ্ট। দলটির সাবেক আমির গোলাম আযম ১৯৯৪ সালে বলেন, ‘নবী ছাড়া কে দোষী নয়, দোষ কমবেশি সবারই আছে। তাই যারা আমার কোনো কাজকে ভুল মনে করেছেন, দুঃখ পেয়েছেন, আমি তাদের সবার কাছে জানাচ্ছি। আপনাদের এই বেদনার সঙ্গে আমি শরীক, আমিও দুঃখিত।’ কিন্তু এই বক্তব্যে সরাসরি কোনো অপরাধ স্বীকার বা নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য দায় নেওয়ার বিষয়টি অনুপস্থিত ছিল।
একইভাবে মতিউর রহমান নিজামী বলেন, ‘আমাদের সে সময়ের রাজনৈতিক অবস্থানটা ভিন্ন ছিল—এটা সকলে জানে।’ তবে তিনি কখনো সরাসরি ক্ষমা চাননি। বরং তিনি লুটপাট বা ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বর্তমান আমির শফিকুর রহমানও একই ধাঁচের বক্তব্য দিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘৪৭ থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত…আমাদের দ্বারা যে যেখানে যত কষ্ট পেয়েছেন, আমরা বিনা শর্তে, যারা কষ্ট পেয়েছেন, আমরা মাফ চাই।’ তবে একই বক্তব্যে তিনি অতীতের সমালোচনায় না গিয়ে ‘ফরওয়ার্ড লুকিং’ হওয়ার কথা বলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য প্রকৃত অর্থে ক্ষমা চাওয়া নয়, বরং একটি কৌশলী রাজনৈতিক অবস্থান।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী মাঝে মাঝে ক্ষমা চাওয়ার কথা বললেও তা মূলত রাজনৈতিক চাপে পড়ে বলে, যা তাদের আন্তরিক ইচ্ছা বা অপরাধ স্বীকারের সাহস থেকে আসে না।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আরও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘অভিযুক্ত পক্ষটি ১৯৭১-এর অপরাধগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে সেগুলোকে হাসি-তামাশা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিষয় হিসেবে গণ্য করে। তাদের এই আচরণের মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হয় যে, তারা সেই অপরাধগুলোকে অপরাধ হিসেবে স্বীকার করতেই রাজি নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে যারা জামায়াতে আছেন, তারা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী সরাসরি যুক্ত না থাকলেও যদি তারা সেই একই রাজনীতিকে ধারণ করেন বা সেই আদর্শকে প্রত্যাখ্যান না করেন, তবে তারাও সমানভাবে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।’
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রীয় অবস্থান। স্বাধীনতার পর দালাল আইনের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তা থেমে যায়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তির বিচার হলেও দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি বড় রাজনৈতিক ও আইনি শূন্যতা তৈরি করেছে। কারণ ব্যক্তি পর্যায়ে বিচার হলেও সংগঠনের দায় নির্ধারণ না হলে পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয় না।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কোনো সরকারই এখন পর্যন্ত দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে ১৯৭১ সালের গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করে মামলা করেনি। এমনকি তাদের যে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল, তা-ও ১৯৭১-এর অপরাধের জন্য নয়, বরং তাদের গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে হয়েছিল।’
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—জামায়াতের ‘ক্ষমা চাওয়া’ কি সত্যিই দায় স্বীকারের প্রতিফলন, নাকি তা রাজনৈতিক টিকে থাকার কৌশল?
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ক্ষমা চাওয়ার কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে—অপরাধের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি, ভুক্তভোগীদের প্রতি নিঃশর্ত ক্ষমা, পুনরাবৃত্তি না হওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা। কিন্তু জামায়াতের বক্তব্যে এই উপাদানগুলোর স্পষ্ট উপস্থিতি নেই।
বরং দেখা যায়, তারা একদিকে ‘দুঃখ প্রকাশ’ করছে, অন্যদিকে একইসঙ্গে অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করছে বা তা ‘রাজনৈতিক অবস্থান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। ফলে এই বক্তব্যগুলো অনেকের কাছে ‘দায় এড়ানোর ভাষা’ হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, একাত্তরের প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান এখনো একটি অমীমাংসিত অধ্যায়। দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট দায় স্বীকার না আসা পর্যন্ত এই বিতর্কের অবসান হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দলগত দায় নির্ধারণের অভাবও এই প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে।
একাত্তরের ইতিহাস শুধু অতীত নয়—এটি বাংলাদেশের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির অংশ। সেই ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যিকারের জবাবদিহি ও আন্তরিক ক্ষমা ছাড়া কোনো পুনর্মিলন সম্ভব নয়—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খবরটি শেয়ার করুন