ছবি: সংগৃহীত
দেশে সম্প্রতি দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে সরকার “ফ্যামিলি কার্ড” কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে নগদ সহায়তা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারি এই উদ্যোগকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারকচক্র।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিও, ছবি ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে তারা। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের প্রায় পাঁচ কোটি পরিবারকে ধাপে ধাপে “ফ্যামিলি কার্ড” দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিকভাবে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে প্রায় ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের পণ্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ঘোষণা সামনে আসার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। অনেকেই আশা করতে থাকেন যে এই কার্ডের মাধ্যমে তারা নিয়মিত সরকারি সহায়তা পাবেন। কিন্তু মানুষের এই আগ্রহ ও প্রত্যাশাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকচক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ভুয়া প্রচারণা চালাতে শুরু করে।
প্রতারণার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—ডিপফেক প্রযুক্তির ব্যবহার। প্রতারকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, টেলিভিশন চ্যানেলের লোগো বা সংবাদ উপস্থাপকের ভিডিও সম্পাদনা করে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন সরকারিভাবেই ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন শুরু হয়েছে।
কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলের লোগো ব্যবহার করে বলা হচ্ছে—“ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ টাকা পেতে এখনই আবেদন করুন।” আবার কোথাও কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের মতো করে কৃত্রিম ভিডিও তৈরি করে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে নিবন্ধন করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এই ধরনের ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন হিসেবেও প্রচার করা হচ্ছে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে এগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া।
ডিপফেক ভিডিওর সঙ্গে দেওয়া থাকে একটি লিংক, যা সাধারণত কোনো অচেনা ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। সেখানে “ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন ফর্ম” নামে একটি পৃষ্ঠা তৈরি করা হয়।
এই ফর্মে আবেদনকারীদের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য দিতে বলা হয়। কখনো কখনো আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ “রেজিস্ট্রেশন ফি” বা “প্রসেসিং চার্জ” দেওয়ার কথাও বলা হয়।
এভাবে প্রতারকরা একদিকে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে, অন্যদিকে মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রতারণা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক। বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভুয়া প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মেটার বিজ্ঞাপন লাইব্রেরিতেও “ফ্যামিলি কার্ড আবেদন” শিরোনামে একাধিক ভিডিও ও পোস্ট সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
এই পোস্টগুলোতে বিভিন্ন ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয়, যেখানে গিয়ে আবেদন করার কথা বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব ওয়েবসাইট দেখতে সরকারি ওয়েবসাইটের মতো করে তৈরি করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হয়।
শুধু অনলাইনে নয়, মাঠপর্যায়েও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
যেমন, সাতক্ষীরার একটি ঘটনায় প্রতারকরা ৫০-এর বেশি নারীর কাছ থেকে ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ করে। পরে স্থানীয় লোকজন বিষয়টি বুঝতে পেরে একজনকে আটক করে।
আবার ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় অনলাইনে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করার নামে প্রতি ব্যক্তির কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়ার ঘটনাও তদন্তে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এসব ঘটনায় বোঝা যায়, প্রতারণা শুধু ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ নয়; অনেক জায়গায় স্থানীয় পর্যায়েও এ ধরনের প্রতারণা সংগঠিত হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড পেতে কোনো ধরনের ফি বা অর্থ প্রদানের প্রয়োজন নেই। সরকার সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এই কার্ড বিতরণ করবে। কেউ যদি কার্ডের নামে টাকা দাবি করে, তবে তাকে প্রতারক হিসেবে গণ্য করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের নির্বাচন স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা দপ্তরের মাধ্যমে সরাসরি করা হবে। সাধারণ মানুষকে কোনো অচেনা ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন করার প্রয়োজন নেই।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক প্রযুক্তি এখন প্রতারকদের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি ভিডিও এতটাই বাস্তবসম্মত যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সহজে শনাক্ত করা কঠিন।
তারা মনে করেন, এ ধরনের প্রতারণা রোধ করতে হলে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মানুষকে শেখাতে হবে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যে কোনো সরকারি ঘোষণা যাচাই করা, অচেনা ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য না দেওয়া, সরকারি সহায়তার নামে টাকা চাইলে সন্দেহ করা।
ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দরিদ্র মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ধরনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে প্রতারণা বাড়লে প্রকৃত সুবিধাভোগীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ডিপফেক প্রযুক্তি ও ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার করে যে প্রতারণা চালানো হচ্ছে, তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়—মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং প্রতারকদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো সরকারি সহায়তা বা সামাজিক কর্মসূচির তথ্য পাওয়ার জন্য সবসময় বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম বা সরকারি সূত্রের ওপর নির্ভর করা। তবেই এই ধরনের ডিপফেক প্রতারণা থেকে সাধারণ মানুষ নিজেদের রক্ষা করতে পারবে।
খবরটি শেয়ার করুন