ছবি: সংগৃহীত
প্রবীণ রাজনীতিবিদ, জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জন্মদিনে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণামূলক ও মূল্যায়নধর্মী একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক এবং সম্পাদক পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজাম।
এতে তিনি বলেন, জুলাই ২০২৪ সালের শেষ সপ্তাহে একদিন ফোন করলাম। ফোন ধরেই আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তিনি বললেন, কই আছ? এসো। জবাবে বললাম, আছেন অফিসে? তিনি বললেন, আর যাব কই? গেলাম ইত্তেফাক অফিসে। বসে আছেন তিনি। সামনে থাকা লোকজনকে মুহূর্তে বিদায় করলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী খবর, বলো?
তিনি বলেন, বললাম, ভুলের সমুদ্রে সবই শেষ। তিনি বললেন, তাই তো মনে হচ্ছে। উত্তরণের পথ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বললেন, মনে হয় না। তোমার কি মত? বললাম, আমারও তাই মনে হচ্ছে। প্রতিবেশীসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গন নিয়েও কথা হলো। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে আমাদের অনেকের সম্পর্কটা এমনই ছিল।
তিনি বলেন, বন্ধু (প্রয়াত সাংবাদিক) পীর হাবিবুর রহমান ও আমি মাঝে মাঝে হাজির হতাম মঞ্জু ভাইয়ের ধানমন্ডির বাড়িতে। ডিনার করে মধ্য রাতে বাড়ি ফিরতাম। অনেক রাতে আড্ডার পর ওনার গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিত। এই জীবনে কোনোদিন তার সঙ্গে কাজ করা হয়নি। তারপরও সবসময় অভিভাবক মনে হতো। বয়সের বিশাল ব্যবধান গুঁড়িয়ে তিনি চলতেন নবীনদের সঙ্গে অনেকটা ভাই-বন্ধুর মতো।
নঈম নিজামের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আজ সোমবার (৯ই ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এই পোস্ট এর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেন তার পোস্টের মন্তব্যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
দীর্ঘ পোস্টে কলামিস্ট নঈম নিজাম লেখেন, আমার দেখা ভিন্ন ধরনের এক ব্যক্তিত্ব। আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন। তার আড্ডার এক টেবিলে দেখেছি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, হাসানুল হক ইনু, কাজী ফিরোজ রশীদসহ অনেককে। সাংবাদিকদের মধ্যে পেয়েছি মতিউর রহমান চৌধুরী, নূরুল কবীর, আমীর খসরু, পীর হাবিবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল তিতুমীর, জাহেদুল আহসান পিন্টু, আশীষ সৈকত, সালেহ উদ্দিনসহ আরও অনেককে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংবাদিকতা দুই অঙ্গনেই তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।
তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও দলীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনই গণমাধ্যমের জগতে থেকেও একটি প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছেন। ইত্তেফাকের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু মালিকানা বা প্রশাসনিক নয়, আমার মনে হয়, এটি একধরনের দায়বদ্ধতা, ঐতিহ্য রক্ষা এবং সংবাদপত্রকে একটি মূল্যবোধের জায়গায় ধরে রাখার প্রয়াস।
তিনি বলেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জানেন কখন কথা বলতে হয়, আবার কখন নীরবতাও শক্তিশালী বার্তা দেয়। ক্ষমতার খুব কাছে থেকেও তিনি নিজেকে প্রচারের আলোয় আনতে চাননি। বরং পর্দার আড়াল থেকে প্রভাব বিস্তার, সমঝোতা গড়া এবং সংকটকালে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারতেন।
তিনি বলেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে আমি সবসময় একজন প্রজ্ঞাবান, ধীরস্থির ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখি। আর ইত্তেফাকের ইতিহাসে তিনি থাকবেন এক দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে, যিনি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন নীরবে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে।
তিনি বলেন, ইত্তেফাক তার হাতে শুধু একটি পত্রিকা ছিল না; ছিল ইতিহাসের ধারক। সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকলেও মর্যাদা নষ্ট হয়নি। জীবিতকালে আমরা কাউকে সম্মান জানাই না। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে রাজনৈতিক ভিন্নমত অবশ্যই আছে।
সবশেষে তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমার চোখে ভিন্ন উচ্চতার মানুষ। ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে একটা দুঃখবোধ ছিল, ১৯৯৬ সাল ও ২০১৪ সালে সরকারে যোগদানের কথা জানি, সেসব কথা আরেক দিন বলব। আজ তার জন্মদিন। শুভ জন্মদিন, দ্য মিডিয়া বস। অনেক শুভকামনা। দীর্ঘজীবন হোক আপনার।
প্রসঙ্গত, ১৯৪৪ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি পিরোজপুর জেলাধীন ভান্ডারিয়া উপজেলার পূর্ব ভান্ডারিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি পিরোজপুর-২ আসন থেকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
সবশেষ ২০২৪ সালের গত ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৪–দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজের কাছে পরাজিত হন তিনি।
২০১৪ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করলে তাতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি একসময় দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
খবরটি শেয়ার করুন