ছবি: সংগৃহীত
কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও বিতর্কিত বক্তা আমির হামজার এক ওয়াজ মাহফিলে দেওয়া বক্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাজনীতিতে ভাষার শালীনতা ও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন। নারী সংসদ সদস্যদের শারীরিক গঠন নিয়ে তার ‘বডি শেমিং’ মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া—রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
ভিডিওতে আমির হামজাকে সংসদে নিজের পাশের আসনে বসা নারী সদস্যদের শারীরিক গঠন নিয়ে কটাক্ষ করতে শোনা যায়। যদিও তিনি পরবর্তীতে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু মনে করতে না পারার কথা বলেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন—মিডিয়ার আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নেই কি না। কিন্তু তার এই প্রতিক্রিয়া বিতর্ক প্রশমিত করার বদলে বরং প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে—জনপ্রতিনিধির ভাষা ও দায়িত্ববোধ কোথায় দাঁড়িয়ে?
এই মন্তব্যের প্রতিবাদে ফরিদপুরে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টি শুধু অনলাইন বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নেই, মাঠের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। সমাবেশে নেতারা মন্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন, অন্যথায় আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছেন।
সংসদের ভেতর থেকেও এসেছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা মন্তব্যটিকে আমির হামজার ‘অসভ্য আচরণের ধারাবাহিকতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। অন্যদিকে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন মন্তব্যটিকে শুধু নারী এমপিদের নয়, পুরো নারী সমাজের প্রতি অপমান হিসেবে দেখেছেন।
এমনকি তার নিজের দলীয় সূত্রেও অস্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের এক নেতা বলেছেন, তাকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে এবং দল বিষয়টি নিয়ে বিব্রত।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের মন্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সমাজে দীর্ঘদিনের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, “নারীর শরীরকে কেন্দ্র করে কটাক্ষ করা আসলে ক্ষমতার ভাষা। যখন কোনো নারী জনপরিসরে দৃশ্যমান হন, তখন তাকে ছোট করার জন্য শরীরকে টার্গেট করা হয়—এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা।”
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যের প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত। গণমাধ্যম বিশ্লেষক এক গবেষক বলেন, “একজন এমপি যখন এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করেন, তা সমাজে বৈধতা পায়। ফলে সাধারণ মানুষও একই ধরনের মন্তব্য করতে উৎসাহিত হতে পারে।”
আইনবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই ধরনের বক্তব্য নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণের শামিল এবং প্রয়োজনে আইনি কাঠামোর মধ্যেও তা বিবেচনা করা যেতে পারে, যদিও বাস্তবে এমন ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ কমই দেখা যায়।
ফেসবুক ও ইউটিউবে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের বড় একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই লিখেছেন, একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে এমন ভাষা অগ্রহণযোগ্য। কেউ কেউ এটিকে ‘নারী বিদ্বেষী মানসিকতার প্রকাশ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “যারা আইন প্রণয়ন করেন, তাদের ভাষা যদি এমন হয়, তাহলে সমাজে শালীনতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?” আরেকজন লিখেছেন, “এটি শুধু একজন ব্যক্তির মন্তব্য নয়, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি সমস্যা।”
তবে কিছু ব্যবহারকারী এটিকে ‘ওয়াজের প্রসঙ্গভিত্তিক বক্তব্য’ বলে হালকাভাবে দেখারও চেষ্টা করেছেন, যদিও সেই মতামত তুলনামূলকভাবে কম।
দেশের রাজনীতিতে কটূক্তি বা ব্যক্তিগত আক্রমণ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এ ধরনের বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতিতে শালীনতা ও জবাবদিহি কেবল নীতিগত বিষয় নয়, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।
জনপ্রতিনিধিরা যখন সীমা লঙ্ঘন করেন, তখন শুধু ব্যক্তিগত ইমেজ নয়, প্রতিষ্ঠান হিসেবেও সংসদের মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—দলগুলো কি নিজেদের সদস্যদের বক্তব্যের দায় নেবে, নাকি এমন বিতর্ক বারবারই ফিরে আসবে?
খবরটি শেয়ার করুন