শুক্রবার, ৩রা এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** নারী এমপিদের নিয়ে আমির হামজার কুৎসিত বক্তব্যের বিচার চাইলেন রুমিন ফারহানা *** প্রধানমন্ত্রীর ৪ বিশেষ সহকারী নিয়োগ *** নারী এমপিদের নিয়ে জামায়াতের আমির হামজার ‘বডি শেমিং’ মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ *** অন্তর্বর্তী সরকারের ২০ অধ্যাদেশ আটকে দেওয়ার সুপারিশ বিশেষ কমিটির *** শেখ হাসিনার আমলের প্রকল্প হওয়ায় রোষানলে পড়ে ইউনূসের *** শনিবার রাজধানীতে ১১ দলের বিক্ষোভ সমাবেশ-মিছিল *** ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে *** ফরাসি সিনেমা ‘লা ভেনাস ইলেকট্রিক’ দিয়ে শুরু হবে কান উৎসব *** দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানে তীব্র আক্রমণের ঘোষণা ট্রাম্পের *** ১২ কেজির এলপিজির দাম বেড়ে ১৭২৮ টাকা

শেখ হাসিনার আমলের প্রকল্প হওয়ায় রোষানলে পড়ে ইউনূসের

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:৫৬ অপরাহ্ন, ২রা এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে দাতা সংস্থার সহায়তায় ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) চালু করে সরকার। পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি স্বাস্থ্যখাতের কর্মীদের কাছে ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ নামে বেশি পরিচিত। এটি বাস্তবায়ন করা হতো অপারেশন প্ল্যান (ওপি), বা বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে। প্রকল্পটি চালু হওয়ার সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা।

প্রকল্পটির মাধ্যমে খাদ্য-পুষ্টি, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য, সংক্রামক-অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদানসহ স্বাস্থ্যের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ, কেনাকাটা, জনবল নিয়োগসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। সেক্টর প্রোগ্রামের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য কার্যক্রমের আওতায় এতদিন সারাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হতো।

এক্ষেত্রে টিকার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব সংস্থা গ্যাভির আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ এতদিন টিকা কিনত ইউনিসেফের মাধ্যমে। ‘এতে টিকা কিনতে সরকারকে খুব একটা বেগ পেতে হতো না এবং সময়ও তুলনামূলকভাবে কম লাগত,’ বলছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. হোসেন।

কিন্তু দাতানির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার পরিকল্পনা করা হয়। ‘দাতানির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি এটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল নিজেদের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়িয়ে সেক্টর প্রোগ্রামগুলোকে মেইনস্ট্রিমিং করা বা রাজস্ব খাতের আওতায় আনা,’ বলছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ এহসানুর রহমান।

সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে সরে আসার ফলে টিকা কেনা বাবদ ইউনিসেফকে দেওয়া অর্থ বেঁচে যাওয়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় অনেক ব্যয় কমে আসার কথাও সুখবর ডটকমকে জানান এই খাতের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা। ২০২২ সালে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারিসহ নানা কারণে সেটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আনা হয়।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ক্ষমতায় আসে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এ সময় বিভিন্ন খাতে সংস্কার নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেয় ইউনূস সরকার।

অভিযোগ উঠেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে এইচপিএনএসপির আওতায় টিকা কর্মসূচি দেশে প্রথম শুরু হওয়ায় প্রকল্পটি রোষানলে পড়ে ড. ইউনূস সরকারের সময়। সরকার কর্মসূচিটি বন্ধ করে দেয় ২০২৪ সালে। এতে দেশে টিকার মজুত ফুরিয়ে যায়। ফলে ঘটনার একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও এখন সামনে এসেছে।

শেখ হাসিনা সরকারের সময় শক্ত ভিত্তি পাওয়া এইচপিএনএসপি ড. ইউনূসের অনির্বাচিত সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পায়নি, বরং সেটি বাতিলের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মানসিকতা কাজ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবতা হলো—যে কারণেই হোক, একটি কার্যকর ব্যবস্থা হঠাৎ ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের।

তারা জানান, এইচপিএনএসপি শুধু টিকাদান নয়; ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও এইডসসহ বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত ছিল। ফলে এই কর্মসূচি বাতিলের প্রভাব স্বাস্থ্য খাতের আরও অনেক অংশে পড়তে পারে। এতে সাবেক ইউনূস সরকারকে জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইনের সময় পেছাতে হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি বিদ্বেষের কারণে টিকা কেনার বিষয়ে এটি আসলে ইউনূস সরকারের গাফিলতি। দফায় দফায় বৈঠক শেষে ২০২৫ সালের মার্চে সেক্টর প্রোগ্রামগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। ফলে  দেশে একের পর এক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এর দায় ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকার এড়াতে পারে না।

এদিকে, দেশে সরকারিভাবে শিশুদের দেওয়া বিভিন্ন রোগের টিকার যে সংকট দেখা দিয়েছে, সেটির জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মন্ত্রী ও নেতাদের কেউ কেউ দায়ী করছেন। হাম আক্রান্ত হয়ে একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের দায় রয়েছে—এমন মন্তব্য করে ফেসবুকসহ সামাজিক বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিও তুলেছেন নাগরিকদের অনেকে।

অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা কেনার ক্ষেত্রে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন আগের সরকারের ‘অদূরদর্শিতার’ কারণে এখন খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে।

তবে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন দাবি করেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা ক্রয়ের সিস্টেমে একটি পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্যোগটি ভালো, কিন্তু সেটি গ্রহণ করা হয়েছে প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই। তাদের এমন অদূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে টিকা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে এবং দেশের স্বাস্থ্যখাতে অবধারিতভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’

তবে ‘টিকা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের যথেষ্ট প্রস্তুতির অভাবের কারণে এগুলো ঘটেছে। সেক্টর প্রোগ্রামগুলো হঠাৎ করে বাদ না দিয়ে ধীরে ধীরে পরিকল্পিতভাবে বের হয়ে আসলে টিকা ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতো না,’ বলেন ডা. মুশতাক হোসেন।

বিষয়টি নিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান, যিনি মূলত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলেও তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কেউ কেউ বলছেন, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত সব ধরনের টিকা কেনায় বিলম্ব ঘটিয়েছে। শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া নিশ্চিত না করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং দাতা সংস্থাগুলো সময় ব্যয় করেছে টিকা কেনার প্রক্রিয়া কী হবে তা ঠিক করতে—সাবেক সরকার সরাসরি টিকা কিনবে নাকি ইউনিসেফের সহায়তা নেবে, আর্থিক লাভ-লোকসান কী হবে—এসব নিয়ে। 

সম্প্রতি হাম-রুবেলার টিকা পেয়েছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। হাম-রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইনের টিকা হাতে এসেছে, তবে সিরিঞ্জ আসেনি। দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন শুরু করতে দেড়-দুই মাস সময় লেগে যাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ—এই জেলাগুলোতে হাম বেশি ছড়িয়েছে। ইতিমধ্যে সাত শতাধিক মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে পঞ্চাশের বেশি।

শেখ হাসিনা ড. মুহাম্মদ ইউনূস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250