শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘বিদেশি অনুদানের দুইশো কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ড. ইউনূস’ *** ড. ইউনূসকে মুখ খুলতে হবে, অর্জন ধরে রাখতে মাঠে নামতে হবে: নাহিদ *** এপ্রিলে আসছে একাধিক তাপপ্রবাহ, যা বলছেন আবহাওয়াবিদরা *** আলোচনা-সমালোচনায় মাহবুব মোর্শেদের অনিয়ম ও দুর্নীতি *** দেশে কাশি আর জাপানে হাসি, মেটিকুলাস নকশার রূপ: মুজতবা দানিশ *** বৈশ্বিক সংকটের ছায়ায় রাজপথের রাজনীতি, সংকট বাড়ার শঙ্কা *** উৎপাদন থাকলেও কেন পেট্রোল-অকটেন সংকট? *** সাংবাদিক তানবিরুল মিরাজকে হয়রানি বন্ধের আহ্বান সিপিজের *** শক্তিশালী সরকারকে হটানো গেছে, এই সরকারকেও হটানো সম্ভব: শহিদুল আলম *** শহিদুল আলমের গতিবিধি নিয়ে প্রশাসনের সন্দেহ

আলোচনা-সমালোচনায় মাহবুব মোর্শেদের অনিয়ম ও দুর্নীতি

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০৬:৩১ অপরাহ্ন, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মাহবুব মোর্শেদ। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এখন জনমনে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের সীমায় আবদ্ধ নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নীতিনৈতিকতা, জবাবদিহি এবং সুশাসনের কাঠামো নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।

আজ শনিবার প্রকাশিত প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি হলো নিজের মালিকানাধীন একটি গাড়ি রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাসসের কাছে ভাড়া দেওয়ার ঘটনা। একজন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিজের সম্পদ থেকে পরোক্ষভাবে আর্থিক সুবিধা নেওয়া—এটি সরাসরি 'স্বার্থের দ্বন্দ্বের' উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই গাড়ির জন্য মাসিক দেড় লাখ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা একই প্রতিষ্ঠানের অন্য গাড়ির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এখানে প্রশ্ন উঠছে—কোন প্রক্রিয়ায় এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল? কেন বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা হয়নি? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কেন এই চুক্তি সম্পর্কে পরিচালনা পর্ষদ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়নি?

রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানের মালিকের বক্তব্যে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। তিনি জানিয়েছেন, পুরো অর্থই মাহবুব মোর্শেদ গ্রহণ করতেন। এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, এটি শুধু নীতিগত বিচ্যুতি নয়, বরং সচেতনভাবে গোপন রেখে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রয়াস হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সময় মাহবুব মোর্শেদের বেতন-ভাতা নির্ধারিত ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নিজেই একটি চুক্তিনামা তৈরি করে নিজের বেতন নির্ধারণ করেন। শুধু মূল বেতন নয়, বরং বিভিন্ন ভাতা—বাড়িভাড়া, আপ্যায়ন, চিকিৎসা, দায়িত্ব ভাতা—সব মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকার একটি প্যাকেজ তৈরি করেন।

এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে উদ্বেগজনক, তা হলো—এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে এমন স্বেচ্ছাচারিতা প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। পরবর্তীতে নিজের বেতন অন্যদের তুলনায় কম মনে হওয়ায় আবার বিশেষ ভাতা হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ঘটনাও তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

মাহবুব মোর্শেদের সময়ে ২২ জন স্থায়ী এবং ৪১ জন খণ্ডকালীন নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এই নিয়োগগুলোর একটি বড় অংশ ছিল এমন পদে, যেগুলো বাসসের অনুমোদিত জনবল কাঠামোয় নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নতুন পদ সৃষ্টি করতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়—কিন্তু সেই প্রক্রিয়া উপেক্ষা করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এটি শুধু প্রশাসনিক নিয়ম লঙ্ঘন নয়; বরং ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও সাংগঠনিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের নিয়োগ প্রায়ই রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আনুগত্য তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

প্রতিবেদনে কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং হয়রানির অভিযোগও উঠে এসেছে। একটি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার প্রধান হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল একটি পেশাদার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু উল্টো অভিযোগগুলো প্রমাণ করে যে, ব্যবস্থাপনায় মানবিকতা ও পেশাদারিত্বের ঘাটতি ছিল।

মাহবুব মোর্শেদকে বাসসের এমডি পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। নিয়োগের সময় তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না—তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়া এবং দ্রুত পদত্যাগ—এই ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ছিল না।

প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক সাংবাদিক এই ঘটনাকে “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নৈতিক অবক্ষয়ের উদাহরণ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এটি কেবল একজন ব্যক্তির অনিয়ম নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।

নেটিজেনদের বড় একটি অংশ মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনা যদি দৃষ্টান্তমূলকভাবে বিচার না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনিয়মের পথ খুলে যাবে।

বর্তমানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। এই বিলম্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত এবং স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

এই ঘটনাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং পুরো সরকারি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সতর্কবার্তা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নৈতিকতার অভাব থাকলে কী ধরনের অপব্যবহার হতে পারে—তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ এটি।

মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রমাণ হলে তা হবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং নৈতিকতার গুরুতর লঙ্ঘনের একটি দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে এটি নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি বার্তা—যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত না করলে তার ফল ভোগ করতে হয় পুরো প্রতিষ্ঠানকেই।

প্রথম আলোর এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নতুন করে প্রমাণ করল যে, শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যম থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার আড়াল করা কঠিন। এখন দেখার বিষয়—তদন্ত কত দ্রুত এবং কতটা নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়, এবং মাহবুব মোর্শেদকে সত্যিই জবাবদিহির আওতায় আনা হয় কি না।

জনগণের প্রত্যাশা একটাই—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। এই প্রত্যাশা পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মাহবুব মোর্শেদ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250