শুক্রবার, ৩রা এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গাড়ির জ্বালানি ৩০ শতাংশ কম নেবেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা *** নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে *** ভারত কি পারবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন খ্রিষ্টান রাষ্ট্র গঠন ঠেকাতে? *** তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে কি বড় সংকট দেখা দেবে? *** অফিস সময় ৯টা-৪টা, মার্কেট বন্ধ সন্ধ্যা ৬টায় *** সাংবাদিকদের হাতকড়া: ক্ষমতার প্রয়োগ না অপপ্রয়োগ? *** নারী এমপিদের নিয়ে আমির হামজার কুৎসিত বক্তব্যের বিচার চাইলেন রুমিন ফারহানা *** প্রধানমন্ত্রীর ৪ বিশেষ সহকারী নিয়োগ *** নারী এমপিদের নিয়ে জামায়াতের আমির হামজার ‘বডি শেমিং’ মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ *** অন্তর্বর্তী সরকারের ২০ অধ্যাদেশ আটকে দেওয়ার সুপারিশ বিশেষ কমিটির

সুখবর এক্সপ্লেইনার

তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে কি বড় সংকট দেখা দেবে?

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন, ৩রা এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা সামনে আসায় জ্বালানি খাত নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও বিদ্যমান তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের কোনো জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নেই।

বরং বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে একটি রিফাইনারির সাময়িক বন্ধ থাকা পুরো ব্যবস্থাকে অচল করে দেয় না। দেশের জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু অপরিশোধিত তেল শোধনের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি এবং দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা হয়।

এই বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জোগান দেয়। ডিজেলের ক্ষেত্রে এর অবদান আরও সীমিত—মোট চাহিদার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ।

অর্থাৎ ডিজেলের বড় অংশই আগে থেকেই আমদানিনির্ভর। ফলে রিফাইনারিটি বন্ধ থাকলেও, যদি আমদানি প্রক্রিয়া সচল থাকে, তাহলে বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, দেশে মাসে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে আসে প্রায় ৬০ হাজার টন। বাকি অংশ আমদানি করে পূরণ করা হয়। এপ্রিল মাসের জন্য ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ৬০ হাজার টনের আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে।

এর সঙ্গে ডিপোগুলোতে মজুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ টনের সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে, যা মাসিক চাহিদার প্রায় ৮৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান বলছে, পরিকল্পিত আমদানি ও মজুত ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে, রিফাইনারি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি নেই। 

বরং এটি ব্যবস্থাপনার একটি পরীক্ষা, যেখানে সময়মতো আমদানি ও বিতরণই মূল চ্যালেঞ্জ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে যে চাপ দেখা যাচ্ছে, সেটি সরবরাহ ঘাটতির কারণে নয়—বরং চাহিদার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর ফলে অনেক গ্রাহক ও ডিলার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি কিনে মজুত করছেন। এতে পেট্রোল পাম্পে কৃত্রিম চাপ তৈরি হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত বছরে জ্বালানির চাহিদা ৩ থেকে ৪ শতাংশ বাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পাম্পে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ডিপো থেকে সরবরাহ বাড়ালেও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে মনে হচ্ছে, সরবরাহ কমে গেছে—যদিও বাস্তবে এটি একটি বিতরণগত চাপ।

অন্যদিকে, পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও স্বস্তিদায়ক। দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রলের পুরো চাহিদা এবং অকটেনের প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে এই দুই জ্বালানির ক্ষেত্রে ইস্টার্ন রিফাইনারির ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক কম।

সম্প্রতি দেশে ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ এসেছে এবং আরও একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। মাসিক চাহিদা ৩৫ হাজার টন হিসেবে এই সরবরাহ দেড় মাসের বেশি সময়ের জন্য যথেষ্ট। একইভাবে, পেট্রলের চাহিদা মাসে ৩০ হাজার টনের কিছু বেশি, যার একটি বড় অংশ দেশীয় উৎপাদন থেকেই আসছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে ইস্টার্ন রিফাইনারির বন্ধ থাকা কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ন্যাফতা উৎপাদন বন্ধ হলে কনডেনসেটের সঙ্গে মিশিয়ে পেট্রল ও অকটেন উৎপাদনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এতে অকটেনের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে।

এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—মজুত সক্ষমতা। জ্বালানি তেলের একটি নির্দিষ্ট মজুত সবসময় ধরে রাখা সরকারের জন্য অপরিহার্য। কারণ, আমদানির সময়সূচিতে সামান্য বিলম্ব হলেও মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে।

বর্তমানে যে সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় কয়েকটি চালান বিলম্বিত হয়েছে। তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে ইতিবাচক সংকেত পাওয়া গেছে, এবং আশা করা হচ্ছে, আটকে থাকা জাহাজগুলো শিগগিরই গন্তব্যে পৌঁছাবে।

যদি এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের চালান এসে পৌঁছায়, তাহলে ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারবে। এতে বর্তমান উদ্বেগ অনেকটাই কমে যাবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্ভাব্য সাময়িক বন্ধ হওয়া একটি সতর্কবার্তা হলেও তাৎক্ষণিক সংকটের পূর্বাভাস নয়। বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বহুমুখী কাঠামোর কার্যকারিতা তুলে ধরছে।

একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে—দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমদানি, শোধন ও মজুত ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আতঙ্কিত না হয়ে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা রাখা। কারণ, তথ্য বলছে, সঠিক সিদ্ধান্ত ও সময়মতো পদক্ষেপ নিলে এই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব।

ইস্টার্ন রিফাইনারি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250